ঢাকা ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo ‘ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক বিজয়ে শক্তিশালী মিডিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে হবে’ Logo আজ মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী Logo যুক্তরাজ্যে আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন হাসনাত আবদুল্লাহ! Logo মেসির সতীর্থ হচ্ছেন ব্রাজিলের তারকা মিডফিল্ডার Logo শীর্ষস্থান দখলের লড়াইয়ে মুখোমুখি জার্মানি-আইভরি কোস্ট Logo তথ্য ফাঁস করলে ইন্সপেক্টরকে গাছে ঝুলাইয়া পে/টাব: পুলিশ কমিশনারের ভিডিও ভাইরাল Logo হরমুজ বন্ধের ঘোষণায় লেবাননে হামলা বন্ধের নির্দেশ নেতানিয়াহুর Logo পানিসম্পদমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে ‘কটূক্তি’, ২০ দিন ধরে কারাগারে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা Logo মহাশূন্যে বিশ্বকাপের বল পাঠিয়ে নতুন বার্তা দিল নাসা Logo জার্মানি-আইভরি কোস্টের গ্রুপসেরার লড়াইয়ে জিতবে কে, যা বলছে পরিসংখ্যান

সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর বাড়ি অযত্নে বিনষ্টের পথে

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৭:৫৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫
  • ৯৭ বার পড়া হয়েছে

অযত্ন-অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নাটোরের বড়াইগ্রামের জোয়াড়ীতে সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর (১৯০১-১৯৮৫) বাড়ি বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাহিত্য ও শিক্ষায় অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকারের দেওয়া ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত প্রমথনাথ বিশীর পৈতৃক জমিদার বাড়ি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এটি জেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

একজন সৃজনশীল লেখক ও মননশীল গবেষক প্রমথনাথ বিশীর একই সঙ্গে একাধারে নাট্যকার, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ হিসাবেও খ্যাতি রয়েছে। প্রমথনাথ বিশী ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুন বড়াইগ্রামের জোয়াড়ী গ্রামে বিশী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নলিনীনাথ বিশী। প্রমথনাথ বিশীর শিক্ষাজীবন শুরু ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি অভিনয় শেখেন এবং পরে তার লেখা কয়েকটি যাত্রাপালা শান্তিনিকেতনে অভিনীতও হয়। তিনি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতন থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসাবে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ এবং ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। রামতনু লাহিড়ী গবেষণা বৃত্তি নিয়ে গবেষণা করার পর ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রিপন কলেজে অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপক নিযুক্ত এবং রবীন্দ্র অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হয়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬২-১৯৬৮ মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভার এমএলসি এবং ১৯৭২-১৯৭৮ মেয়াদে ভারতের রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি সাহিত্য ও শিক্ষায় ভারত সরকারের দেওয়া ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত হন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। গবেষণার ক্ষেত্রে প্রধানত রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ হিসাবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এক্ষেত্রে ‘রবীন্দ্র কাব্যপ্রবাহ’, ‘রবীন্দ্র বিচিত্রা’, ‘রবীন্দ্র নাট্যপ্রবাহ’, ‘রবীন্দ্র সরণি’ ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ প্রভৃতি গবেষণাগ্রন্থ তার উল্লেখযোগ্য অবদান। তিনি মধুসূদন ও বঙ্কিম সাহিত্যেরও একজন দক্ষ সমালোচক ছিলেন। ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’, ‘বঙ্কিম সরণি’ ও ‘মধুসূদন থেকে রবীন্দ্রনাথ’ তার এ বিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। গবেষণাগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, কবিতা এবং ব্যঙ্গ রচনার ক্ষেত্রেও প্রমথনাথ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি কমলাকান্ত, বিষ্ণুশর্মা, অমিত রায়, মাধব্য ও স্কট টমসন ছদ্মনামে লিখতেন।

প্রমথনাথ রচিত উপন্যাস ও গল্পের মধ্যে কয়েকটি প্রধান গ্রন্থ হলো-‘জোড়াদিঘির চৌধুরী পরিবার’, ‘কেশবতী’, ‘গল্পের মতো গল্প’, ‘ডাকিনী’, ‘ব্রহ্মার হাসি’, ‘সিন্ধুদেশের প্রহরী’, ‘চলনবিল’, ‘অলৌকিক’, ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’, ‘স্বনির্বাচিত গল্প’, ‘লালকেল্লা’, ‘বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য’ ইত্যাদি।

তার প্রথম কবিতার গ্রন্থ ‘দেওয়ালী’। এছাড়া তার অন্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো-‘অকুন্তলা’, ‘প্রাচীন পারসিক হইতে’, ‘বিদ্যাসুন্দর’, ‘মুক্তবেণী’, ‘বসন্তসেনা ও অন্যান্য কবিতা’, আত্মঘাতিনী, ‘হংসমিথুন’, ‘উত্তরমেঘ’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘কাব্য বিতান’ ‘কিংশুকবহ্নি’ ইত্যাদি। তার লেখা নাটকগুলো হলো- ‘ঝণং কৃত্বা’, ‘ভূতপূর্ব স্বামী’, ‘ঘূতং পিবেৎ’, মৌচাকে ঢিল, পারমিট, ডিনামাইট, ‘গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর’ প্রভৃতি। ‘ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব’, ‘বিচিত্র উপল’ তার প্রবন্ধগ্রন্থ। ‘নেহেরু ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব’ নামে তিনি একটি রাজনৈতিক গ্রন্থও লিখেছেন। সাহিত্যচর্চা এবং গবেষণায় কৃতিত্বের জন্য প্রমথনাথ রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬০), বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮২) ও জগত্তারিণী পুরস্কার (১৯৮৩) লাভ করেন। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে তিনি মারা যান।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা সদর থেকে উত্তরে ৫ কিলোমিটার দূরে জোয়াড়ী গ্রাম। এখানেই প্রকৃতির সঙ্গে অনেকটা যুদ্ধ করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রমথনাথ বিশীর পৈতৃক ভিটা ঐতিহ্যবাহী বিশী জমিদার বাড়ি। প্রায় আড়াই একর জমিতে দ্বিতল ভবনের বাড়িটি জমিদার বাড়ির জৌলুস হারিয়ে বন্দি হয়ে পড়েছে গাছের শেকড় আর লতাপাতায়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়ছে। চুরি হয়ে গেছে অনেকাংশের ইট। আর যেটুকু অবশিষ্ট আছে তার দেওয়াল ও ঘরের ছাদ থেকে খসে পড়ছে নিপুণ কারুকার্যখচিত পলেস্তারা। সবুজেঘেরা বাড়ির পূর্বপাশে রয়েছে বিশাল পুকুর। কিন্তু এক সময়ের দৃষ্টিনন্দন শান বাঁধানো ঘাটের এখন আর অস্তিত্ব নেই। তবে রয়েছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো শিব মন্দির। তার বাবার ছিল দুটি তরফ। ’৪৭ সালে দেশভাগের পর তারা কলকাতা চলে যান। সেই থেকে তাদের বাড়িঘর-সম্পত্তি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রামের কিছু মানুষ বাড়ির বিভিন্ন অংশ দখল করে সেখানে বসবাস করছেন। কেউ কেউ ওই ভিটায় আলাদা বাড়িও তুলেছেন। এছাড়া তাদের রেখে যাওয়া প্রায় ১৫ একর জমির আমবাগানের সব গাছ কেটে নিয়ে গেছে প্রভাবশালীরা। বর্তমানে সেসব জমিও হাতছাড়া হয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, এখনো দর্শনার্থীরা জমিদার বাড়িটি দেখতে আসেন, ছবি তোলেন। একসময় দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য বাড়িটির সামনে ‘সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর বাড়ি’ লেখা নামফলক স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেটির অস্তিত্ব নেই।

এখানে সরকারিভাবে এ সাহিত্যিকের নামে কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় সাহিত্যপ্রেমী মানুষরা ওই বাড়িতে কখনো কখনো তার লেখা সাহিত্য পাঠ ও আলোচনা সভার আয়োজন করাসহ তার স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ নিলেও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পরবর্তীকালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য স্থানীয়রা এখানে সরকারিভাবে এ লেখকের লেখা বইসহ অন্যান্য লেখকের বই নিয়ে একটি পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা এবং দর্শনার্থীদের জন্য পাবলিক টয়লেট ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।

জোয়াড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী আকবর বলেন, বাড়িটি এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকলে এমন একজন গুণী মানুষের কোনো স্মৃতি ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তবে ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ এ বাড়িটিও হতে পারে নাটোরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, এটি আমাদের এলাকার মধ্যে একটি ঐতিহ্যপূর্ণ বাড়ি। এটি সংরক্ষণ আরও আগে থেকেই করা দরকার ছিল। তবে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বাড়িটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক বিজয়ে শক্তিশালী মিডিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে হবে’

সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর বাড়ি অযত্নে বিনষ্টের পথে

আপডেট সময় ০৭:৫৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৫

অযত্ন-অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নাটোরের বড়াইগ্রামের জোয়াড়ীতে সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর (১৯০১-১৯৮৫) বাড়ি বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাহিত্য ও শিক্ষায় অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকারের দেওয়া ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত প্রমথনাথ বিশীর পৈতৃক জমিদার বাড়ি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এটি জেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

একজন সৃজনশীল লেখক ও মননশীল গবেষক প্রমথনাথ বিশীর একই সঙ্গে একাধারে নাট্যকার, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ হিসাবেও খ্যাতি রয়েছে। প্রমথনাথ বিশী ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুন বড়াইগ্রামের জোয়াড়ী গ্রামে বিশী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নলিনীনাথ বিশী। প্রমথনাথ বিশীর শিক্ষাজীবন শুরু ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি অভিনয় শেখেন এবং পরে তার লেখা কয়েকটি যাত্রাপালা শান্তিনিকেতনে অভিনীতও হয়। তিনি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতন থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসাবে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ এবং ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। রামতনু লাহিড়ী গবেষণা বৃত্তি নিয়ে গবেষণা করার পর ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রিপন কলেজে অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপক নিযুক্ত এবং রবীন্দ্র অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হয়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬২-১৯৬৮ মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভার এমএলসি এবং ১৯৭২-১৯৭৮ মেয়াদে ভারতের রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি সাহিত্য ও শিক্ষায় ভারত সরকারের দেওয়া ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত হন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। গবেষণার ক্ষেত্রে প্রধানত রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ হিসাবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এক্ষেত্রে ‘রবীন্দ্র কাব্যপ্রবাহ’, ‘রবীন্দ্র বিচিত্রা’, ‘রবীন্দ্র নাট্যপ্রবাহ’, ‘রবীন্দ্র সরণি’ ‘রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ প্রভৃতি গবেষণাগ্রন্থ তার উল্লেখযোগ্য অবদান। তিনি মধুসূদন ও বঙ্কিম সাহিত্যেরও একজন দক্ষ সমালোচক ছিলেন। ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’, ‘বঙ্কিম সরণি’ ও ‘মধুসূদন থেকে রবীন্দ্রনাথ’ তার এ বিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। গবেষণাগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, কবিতা এবং ব্যঙ্গ রচনার ক্ষেত্রেও প্রমথনাথ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি কমলাকান্ত, বিষ্ণুশর্মা, অমিত রায়, মাধব্য ও স্কট টমসন ছদ্মনামে লিখতেন।

প্রমথনাথ রচিত উপন্যাস ও গল্পের মধ্যে কয়েকটি প্রধান গ্রন্থ হলো-‘জোড়াদিঘির চৌধুরী পরিবার’, ‘কেশবতী’, ‘গল্পের মতো গল্প’, ‘ডাকিনী’, ‘ব্রহ্মার হাসি’, ‘সিন্ধুদেশের প্রহরী’, ‘চলনবিল’, ‘অলৌকিক’, ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’, ‘স্বনির্বাচিত গল্প’, ‘লালকেল্লা’, ‘বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য’ ইত্যাদি।

তার প্রথম কবিতার গ্রন্থ ‘দেওয়ালী’। এছাড়া তার অন্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো-‘অকুন্তলা’, ‘প্রাচীন পারসিক হইতে’, ‘বিদ্যাসুন্দর’, ‘মুক্তবেণী’, ‘বসন্তসেনা ও অন্যান্য কবিতা’, আত্মঘাতিনী, ‘হংসমিথুন’, ‘উত্তরমেঘ’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘কাব্য বিতান’ ‘কিংশুকবহ্নি’ ইত্যাদি। তার লেখা নাটকগুলো হলো- ‘ঝণং কৃত্বা’, ‘ভূতপূর্ব স্বামী’, ‘ঘূতং পিবেৎ’, মৌচাকে ঢিল, পারমিট, ডিনামাইট, ‘গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর’ প্রভৃতি। ‘ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব’, ‘বিচিত্র উপল’ তার প্রবন্ধগ্রন্থ। ‘নেহেরু ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব’ নামে তিনি একটি রাজনৈতিক গ্রন্থও লিখেছেন। সাহিত্যচর্চা এবং গবেষণায় কৃতিত্বের জন্য প্রমথনাথ রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬০), বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮২) ও জগত্তারিণী পুরস্কার (১৯৮৩) লাভ করেন। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে তিনি মারা যান।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা সদর থেকে উত্তরে ৫ কিলোমিটার দূরে জোয়াড়ী গ্রাম। এখানেই প্রকৃতির সঙ্গে অনেকটা যুদ্ধ করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রমথনাথ বিশীর পৈতৃক ভিটা ঐতিহ্যবাহী বিশী জমিদার বাড়ি। প্রায় আড়াই একর জমিতে দ্বিতল ভবনের বাড়িটি জমিদার বাড়ির জৌলুস হারিয়ে বন্দি হয়ে পড়েছে গাছের শেকড় আর লতাপাতায়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়ছে। চুরি হয়ে গেছে অনেকাংশের ইট। আর যেটুকু অবশিষ্ট আছে তার দেওয়াল ও ঘরের ছাদ থেকে খসে পড়ছে নিপুণ কারুকার্যখচিত পলেস্তারা। সবুজেঘেরা বাড়ির পূর্বপাশে রয়েছে বিশাল পুকুর। কিন্তু এক সময়ের দৃষ্টিনন্দন শান বাঁধানো ঘাটের এখন আর অস্তিত্ব নেই। তবে রয়েছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো শিব মন্দির। তার বাবার ছিল দুটি তরফ। ’৪৭ সালে দেশভাগের পর তারা কলকাতা চলে যান। সেই থেকে তাদের বাড়িঘর-সম্পত্তি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রামের কিছু মানুষ বাড়ির বিভিন্ন অংশ দখল করে সেখানে বসবাস করছেন। কেউ কেউ ওই ভিটায় আলাদা বাড়িও তুলেছেন। এছাড়া তাদের রেখে যাওয়া প্রায় ১৫ একর জমির আমবাগানের সব গাছ কেটে নিয়ে গেছে প্রভাবশালীরা। বর্তমানে সেসব জমিও হাতছাড়া হয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, এখনো দর্শনার্থীরা জমিদার বাড়িটি দেখতে আসেন, ছবি তোলেন। একসময় দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য বাড়িটির সামনে ‘সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর বাড়ি’ লেখা নামফলক স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেটির অস্তিত্ব নেই।

এখানে সরকারিভাবে এ সাহিত্যিকের নামে কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় সাহিত্যপ্রেমী মানুষরা ওই বাড়িতে কখনো কখনো তার লেখা সাহিত্য পাঠ ও আলোচনা সভার আয়োজন করাসহ তার স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ নিলেও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পরবর্তীকালে তা বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য স্থানীয়রা এখানে সরকারিভাবে এ লেখকের লেখা বইসহ অন্যান্য লেখকের বই নিয়ে একটি পাবলিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা এবং দর্শনার্থীদের জন্য পাবলিক টয়লেট ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।

জোয়াড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলী আকবর বলেন, বাড়িটি এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকলে এমন একজন গুণী মানুষের কোনো স্মৃতি ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তবে ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ এ বাড়িটিও হতে পারে নাটোরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, এটি আমাদের এলাকার মধ্যে একটি ঐতিহ্যপূর্ণ বাড়ি। এটি সংরক্ষণ আরও আগে থেকেই করা দরকার ছিল। তবে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বাড়িটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।