ঢাকা ০২:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo ‘ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক বিজয়ে শক্তিশালী মিডিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে হবে’ Logo আজ মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী Logo যুক্তরাজ্যে আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন হাসনাত আবদুল্লাহ! Logo মেসির সতীর্থ হচ্ছেন ব্রাজিলের তারকা মিডফিল্ডার Logo শীর্ষস্থান দখলের লড়াইয়ে মুখোমুখি জার্মানি-আইভরি কোস্ট Logo তথ্য ফাঁস করলে ইন্সপেক্টরকে গাছে ঝুলাইয়া পে/টাব: পুলিশ কমিশনারের ভিডিও ভাইরাল Logo হরমুজ বন্ধের ঘোষণায় লেবাননে হামলা বন্ধের নির্দেশ নেতানিয়াহুর Logo পানিসম্পদমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে ‘কটূক্তি’, ২০ দিন ধরে কারাগারে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা Logo মহাশূন্যে বিশ্বকাপের বল পাঠিয়ে নতুন বার্তা দিল নাসা Logo জার্মানি-আইভরি কোস্টের গ্রুপসেরার লড়াইয়ে জিতবে কে, যা বলছে পরিসংখ্যান

ব্রহ্মপুত্রের তীরে ফেলে আসা শৈশবের সেই অপেক্ষা আজ জীবনের গল্প

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ১০:৪৪:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
  • ৫৮ বার পড়া হয়েছে

মোঃ মাইন উদ্দিন :

বয়স যতই বাড়ছে, শৈশবের স্মৃতিগুলো ততই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মনে হয় সময় যত দূরে সরে যায়, স্মৃতিরা তত কাছে এসে দাঁড়ায়। জীবনের ব্যস্ততা, হিসাব-নিকাশ আর কঠিন বাস্তবতার ভিড়ে হঠাৎ করেই কোথা থেকে এসে যেন ভেসে ওঠে সেই সরল দিনের দৃশ্যগুলো।

আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়েই বয়ে গেছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ। ছোটবেলায় সেই নদীর বুক দিয়ে যখন পালের নৌকা পাল উড়িয়ে ছুটে যেত, তখন বিস্ময়ে ভরা নির্মল চোখে আমরা তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, এই নৌকায় চড়ে কত মানুষ কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়! নদীর বুক চিরে নৌকাগুলো কত দূর যায়, আবার কি একই পথে ফিরে আসে? শিশুমনে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না, ছিল শুধু বিস্ময় আর কল্পনার রঙিন ডানা।
আজও যখন নদীর তীরে গিয়ে দাঁড়াই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেইসব দৃশ্য, একেকটা যেন অলীক স্বপ্নের মতো। গোলগাল চোখের সেই শৈশব যেন এখনও কোথাও লুকিয়ে আছে। তবে আগে সেই চেনা মুখগুলো আর দেখা যায় না। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে। এখন নতুন মানুষের ভিড়ে পুরনো মানুষদের হারিয়ে ফেলেছি, তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন।
কখনও কখনও মনে হয়, নতুন মানুষের অরণ্যে কিছু মানুষ বনের বাঘ-ভাল্লুকের চেয়েও ভয়ংকর, সুযোগ পেলেই ছোবল দিতে একটুও দ্বিধা করে না।

তবু ব্রহ্মপুত্র নদ আর পালের নৌকা, এই দুটো আমার কাছে আজও নিখাদ নস্টালজিয়া। সময়ের স্রোতে ব্রহ্মপুত্র আর আগের মতো নেই, যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে পালের নৌকাও প্রায় বিলুপ্ত। তারপরও লেখালেখির জীবনে একটু সুযোগ পেলেই বিকেলে নদীর তীরে গিয়ে দাঁড়াই। কল্পনায় দেখি, দূরে কোথাও একটি পালের নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। সেই দৃশ্য মনে এক অদ্ভুত শীতলতা এনে দেয়। মনে হয়, ক্লান্ত মন একটু মমতার ছায়া খুঁজে পেয়েছে।
জীবন আসলে এক অদ্ভুত যোগ-বিয়োগের হিসাব। মানুষ দূরে সরে যায়, সম্পর্ক বদলে যায়, সময় সবকিছুকে ভেঙে নতুনভাবে সাজায়। কখনও মনে হয় ভগ্নাংশের অঙ্কের মতোই জীবনের হিসাব, কোথাও যেন ঠিক মেলাতে পারি না। ভাগ-বাটোয়ারার এই জীবনে কখনও নিজেকে মনে হয় দূরের কোনো তালগাছ, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ এক প্রতীক।
ছোটবেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, মেঘগুলো এত দূরে কোথা থেকে আসে, আবার কোথায় চলে যায়। তখন কল্পনায় ভেসে উঠত রূপকথার সেই ডালিম কুমার, মেঘের ওপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে উড়ে যাচ্ছে। শৈশবের সেই কল্পনার ডানা আজ আর নেই, কিন্তু স্মৃতিরা মাঝে মাঝে সেই আকাশেই উড়তে চায়।
এখন বসন্তকাল। পলাশ-শিমুলের লাল রঙে চারপাশ যেন নতুন করে জেগে ওঠেছে। আকাশে মেঘ না থাকলেও মনের আকাশে মেঘের আনাগোনা থেমে থাকে না। মনে হয়, বিশাল সেই আকাশ যেন কোথাও আমার হৃদয়ের ভেতরেই আঁকা ডোরাকাটা মেঘের দাগে ভরা এক বিস্তীর্ণ স্মৃতির মানচিত্র। এই শহরে আমার তেমন কোনো আত্মীয় নেই, তবু আকাশটাকেই কখনও কখনও আপন মনে হয়।

শৈশবের আরেকটি দৃশ্য আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। শুক্রবার বিকেল হলেই আমরা ছুটে যেতাম নদীর ঘাটে। নরসিংদীর বেলাব সাপ্তাহিক হাট থেকে নৌকায় করে বাবা কখন ফিরবেন, সেই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। কখন ঘাটে ভিড়বে বাবাকে বহন করা নৌকা, এই প্রত্যাশায় চোখ থাকত নদীর বুকের দিকে।

বাবা-চাচাদের সেই গন্ধ, সেই উপস্থিতি, অদ্ভুত এক নিরাপত্তা দিত। মনে হতো, তারা থাকলে কোনো দুর্ভাগ্য কাছে ভিড়তে পারবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলে যায়, সম্পর্কের ভেতরেও কখনও কখনও অদৃশ্য চক্রান্ত জন্ম নেয়। তখন স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসাও কোথাও যেন হারিয়ে যেতে থাকে। মন ভরে ওঠে বিষাদে, এক ধরনের নিঃশব্দ যন্ত্রণায়।
এই যন্ত্রণার কথা সবসময় কাউকে বলা যায় না। বুকের ভেতরেই জমে থাকে অগণিত অপ্রকাশিত বেদনা। তবু সেই বেদনার মাঝেও স্মৃতিরা বেঁচে থাকে, নদীর ঢেউয়ের মতোই নিঃশব্দে ফিরে ফিরে আসে।

হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম, সময় যত এগোয়, মানুষ তত পেছনে তাকায়। তাই বয়স যতই বাড়ছে, শৈশবের সেই নদী, সেই পালের নৌকা আর সেই অপেক্ষার বিকেলগুলো আরও বেশি করে মনে পড়ছে। মনে হয়, স্মৃতিরা যেন এসে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলছে, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু শৈশব কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক বিজয়ে শক্তিশালী মিডিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে হবে’

ব্রহ্মপুত্রের তীরে ফেলে আসা শৈশবের সেই অপেক্ষা আজ জীবনের গল্প

আপডেট সময় ১০:৪৪:৪০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

মোঃ মাইন উদ্দিন :

বয়স যতই বাড়ছে, শৈশবের স্মৃতিগুলো ততই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মনে হয় সময় যত দূরে সরে যায়, স্মৃতিরা তত কাছে এসে দাঁড়ায়। জীবনের ব্যস্ততা, হিসাব-নিকাশ আর কঠিন বাস্তবতার ভিড়ে হঠাৎ করেই কোথা থেকে এসে যেন ভেসে ওঠে সেই সরল দিনের দৃশ্যগুলো।

আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়েই বয়ে গেছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ। ছোটবেলায় সেই নদীর বুক দিয়ে যখন পালের নৌকা পাল উড়িয়ে ছুটে যেত, তখন বিস্ময়ে ভরা নির্মল চোখে আমরা তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, এই নৌকায় চড়ে কত মানুষ কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়! নদীর বুক চিরে নৌকাগুলো কত দূর যায়, আবার কি একই পথে ফিরে আসে? শিশুমনে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না, ছিল শুধু বিস্ময় আর কল্পনার রঙিন ডানা।
আজও যখন নদীর তীরে গিয়ে দাঁড়াই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেইসব দৃশ্য, একেকটা যেন অলীক স্বপ্নের মতো। গোলগাল চোখের সেই শৈশব যেন এখনও কোথাও লুকিয়ে আছে। তবে আগে সেই চেনা মুখগুলো আর দেখা যায় না। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে। এখন নতুন মানুষের ভিড়ে পুরনো মানুষদের হারিয়ে ফেলেছি, তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন।
কখনও কখনও মনে হয়, নতুন মানুষের অরণ্যে কিছু মানুষ বনের বাঘ-ভাল্লুকের চেয়েও ভয়ংকর, সুযোগ পেলেই ছোবল দিতে একটুও দ্বিধা করে না।

তবু ব্রহ্মপুত্র নদ আর পালের নৌকা, এই দুটো আমার কাছে আজও নিখাদ নস্টালজিয়া। সময়ের স্রোতে ব্রহ্মপুত্র আর আগের মতো নেই, যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে পালের নৌকাও প্রায় বিলুপ্ত। তারপরও লেখালেখির জীবনে একটু সুযোগ পেলেই বিকেলে নদীর তীরে গিয়ে দাঁড়াই। কল্পনায় দেখি, দূরে কোথাও একটি পালের নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। সেই দৃশ্য মনে এক অদ্ভুত শীতলতা এনে দেয়। মনে হয়, ক্লান্ত মন একটু মমতার ছায়া খুঁজে পেয়েছে।
জীবন আসলে এক অদ্ভুত যোগ-বিয়োগের হিসাব। মানুষ দূরে সরে যায়, সম্পর্ক বদলে যায়, সময় সবকিছুকে ভেঙে নতুনভাবে সাজায়। কখনও মনে হয় ভগ্নাংশের অঙ্কের মতোই জীবনের হিসাব, কোথাও যেন ঠিক মেলাতে পারি না। ভাগ-বাটোয়ারার এই জীবনে কখনও নিজেকে মনে হয় দূরের কোনো তালগাছ, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ এক প্রতীক।
ছোটবেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, মেঘগুলো এত দূরে কোথা থেকে আসে, আবার কোথায় চলে যায়। তখন কল্পনায় ভেসে উঠত রূপকথার সেই ডালিম কুমার, মেঘের ওপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে উড়ে যাচ্ছে। শৈশবের সেই কল্পনার ডানা আজ আর নেই, কিন্তু স্মৃতিরা মাঝে মাঝে সেই আকাশেই উড়তে চায়।
এখন বসন্তকাল। পলাশ-শিমুলের লাল রঙে চারপাশ যেন নতুন করে জেগে ওঠেছে। আকাশে মেঘ না থাকলেও মনের আকাশে মেঘের আনাগোনা থেমে থাকে না। মনে হয়, বিশাল সেই আকাশ যেন কোথাও আমার হৃদয়ের ভেতরেই আঁকা ডোরাকাটা মেঘের দাগে ভরা এক বিস্তীর্ণ স্মৃতির মানচিত্র। এই শহরে আমার তেমন কোনো আত্মীয় নেই, তবু আকাশটাকেই কখনও কখনও আপন মনে হয়।

শৈশবের আরেকটি দৃশ্য আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। শুক্রবার বিকেল হলেই আমরা ছুটে যেতাম নদীর ঘাটে। নরসিংদীর বেলাব সাপ্তাহিক হাট থেকে নৌকায় করে বাবা কখন ফিরবেন, সেই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। কখন ঘাটে ভিড়বে বাবাকে বহন করা নৌকা, এই প্রত্যাশায় চোখ থাকত নদীর বুকের দিকে।

বাবা-চাচাদের সেই গন্ধ, সেই উপস্থিতি, অদ্ভুত এক নিরাপত্তা দিত। মনে হতো, তারা থাকলে কোনো দুর্ভাগ্য কাছে ভিড়তে পারবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলে যায়, সম্পর্কের ভেতরেও কখনও কখনও অদৃশ্য চক্রান্ত জন্ম নেয়। তখন স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসাও কোথাও যেন হারিয়ে যেতে থাকে। মন ভরে ওঠে বিষাদে, এক ধরনের নিঃশব্দ যন্ত্রণায়।
এই যন্ত্রণার কথা সবসময় কাউকে বলা যায় না। বুকের ভেতরেই জমে থাকে অগণিত অপ্রকাশিত বেদনা। তবু সেই বেদনার মাঝেও স্মৃতিরা বেঁচে থাকে, নদীর ঢেউয়ের মতোই নিঃশব্দে ফিরে ফিরে আসে।

হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম, সময় যত এগোয়, মানুষ তত পেছনে তাকায়। তাই বয়স যতই বাড়ছে, শৈশবের সেই নদী, সেই পালের নৌকা আর সেই অপেক্ষার বিকেলগুলো আরও বেশি করে মনে পড়ছে। মনে হয়, স্মৃতিরা যেন এসে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলছে, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু শৈশব কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।