ঢাকা ১১:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo স্মরণকালের ভয়াবহ লোডশেডিং: দায় কার এবং মন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা Logo নিউইয়র্কে “জাস্টিস ফর জুলাই মুভমেন্ট” উপলক্ষ্যে গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় Logo ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর Logo এত বজ্রপাত জানলে তো সুনামগঞ্জে বিয়েই করতাম না: স্পিকার Logo সরকারের লক্ষ্য মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া: প্রধানমন্ত্রী Logo মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র আপিলেও বাতিল Logo সরকারি কর্মকর্তাদের মানের বেতন সাংবাদিকদের জন্যও হওয়া উচিত : হুইপ Logo যুদ্ধ ও অস্থিরতায় বিশ্বজুড়ে বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ সামরিক ব্যয় Logo আ. লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন Logo বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী

স্মরণকালের ভয়াবহ লোডশেডিং: দায় কার এবং মন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৯:৩১:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান দেশের প্রতিমান লোডশেডিংয়ের এই সময়ে গ্রামবাংলার সেই পুরনো দৃশ্যগুলো যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে। হারিকেন, কুপির আলো আর রেশনের কেরোসিনের সেই পরিচিত গন্ধ—যা এক সময় আমাদের ঐতিহ্যের অংশ ছিল—তা এখন নিরুপায় হয়েই ফিরে আসছে।
একটা সময় ছিল যখন হারিকেন মোছা বা সলতে ঠিক করা ছিল সন্ধ্যার নিয়মিত কাজ। বিদ্যুৎ আসার পর আমরা এগুলোকে স্টোররুমে বা শোপিস হিসেবে তুলে রেখেছিলাম। এখন লোডশেডিংয়ের দীর্ঘ প্রহর সেই পুরনো ‘বন্ধুদের’ আবার ধুলো ঝেড়ে বের করতে বাধ্য করছে।

গ্রামে একসময় রেশনের কেরোসিন তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ানো ছিল খুব সাধারণ দৃশ্য। বর্তমানের এই লোডশেডিংয়ের দাপটে মানুষ আবার সেই দিনগুলোর কথা ভাবছে। হারিকেনের সেই মৃদু হলুদ আলো যেমন এক ধরণের মায়া তৈরি করে, তেমনি বিদ্যুৎহীন গরমে সেটি বেশ কষ্টদায়কও বটে।
দেশে মফস্বল এরিয়াতে দিনের ১৬-১৭ ঘন্টা করে লোডশেডিং বাস্তবতা নিজে দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে‌। অভ্যাস পরিবর্তন করে আবারও পুরাতন অভ্যাসের দিকে ধাবিত করা যে কতটা কষ্টসাধ্য হয় এখন মফস্বলের প্রত্যেকটা মানুষ আড়ে আড়ে উপলব্ধি করছে।
কারণ গ্রামের এই সহজ সরল পরিবেশটাকে আধুনিক গ্রামের মানুষ এখন বিদ্যুতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যেমন–
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা: হারিকেনের আলোয় আগের মতো মন বসানো বর্তমান প্রজন্মের জন্য বেশ কঠিন।
কৃষিকাজ: সেচ ব্যবস্থার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা এখন অপরিহার্য।
যোগাযোগ: স্মার্টফোন চার্জ দেওয়ার জন্য হলেও এখন মানুষ বিদ্যুতের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে।

বর্তমানে দেশজুড়ে যে ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে, তা জন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এই সংকটের প্রকৃত কারণ কী? সরকার আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বা ইরানের হরমোজ প্রণালীর অস্থিরতাকে দায়ী করছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন—এটি কি কেবলই বৈশ্বিক সংকট, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা আর আমলাতান্ত্রিক অস্বচ্ছতা?
জাতির সাথে কি কোনো লুকোচুরি বা প্রতারণা করা হচ্ছে?

সম্প্রতি সরকারের একজন মন্ত্রী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, কেউ লোডশেডিং প্রমাণ করতে পারলে তিনি পদত্যাগ করবেন!
তার এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে একটি নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। মন্ত্রীর এই দাবি তার নিজ অভিজ্ঞতায় হয়তো সত্য। কারণ, মন্ত্রীরা যে অভিজাত এলাকায় বসবাস করেন, সেখানে লোডশেডিং কল্পনা করাও কঠিন। সংসদ ভবন, মন্ত্রিপাড়া কিংবা তাদের কর্মস্থলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হয়। এমনকি মন্ত্রীরা যখন কোনো এলাকায় সফরে যান, তখন সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে অন্ধকার আর অসহ্য গরমের যে বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দেখছে, তা মন্ত্রীদের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছায় না।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন লোডশেডিং যদি নাই থাকে তাহলে আইনের কড়াকড়ি কেন?
বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে সরকার দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭টার পর মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধের কঠোর আইন করেছে। আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানাও গুনতে হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের। অথচ বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের মফস্বল ও শহরগুলোতে ব্যবসার মূল সময় শুরু হয় বিকেলে। অফিস আদালত কাজ শেষ করে মাগরিবের নামাজের পর কেনাকাটা করতেন।
দোকানপাটের মালিকরা যদি ব্যবসা-বাণিজ্য না করতে পারে তাহলে কি করে তারা কর্মচারীর বেতন পরিশোধ করবেন কিংবা দোকানের মালিক ভাড়া পরিশোধ করবে?
সর্বসাধারণের আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে এই অল্প সময়ে ব্যবসা করে দোকান মালিকরা কীভাবে উচ্চ হারে দোকানের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবেন? যদি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই মূল লক্ষ্য হয়, তবে দিনের বেলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করার পরও কেন রাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে? এটি ক্ষুদ্র অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল।
একদিকে বিদ্যুৎ নেই বলে মানুষের রুটি-রুজির পথ সংকুচিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে বলা হচ্ছে লোডশেডিং নেই—এই দ্বিমুখী অবস্থান জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে জ্বালানি সংকটের জন্য নিম্নের কিছু কারণ সংকটের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন যেমন–
১. মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আমদানি সরবরাহ ব্যাহত যেমন হরমুজ প্রণালী বন্ধ,
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর আমদানি-নির্ভরতা। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৯৫% জ্বালানি (গ্যাস, কয়লা ও তেল) আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গত এক দশকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করায় আজ বিশ্ববাজারের ওপর আমাদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার সংকট অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীর প্রধান অন্যতম কারণ

২. তীব্র ডলার সংকট বিপুল বকেয়া ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি: সরকারের বড় একটি ব্যর্থতা হলো ডলার ম্যানেজমেন্ট। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে:
এলএনজি (LNG) এবং কয়লা আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (LC) খুলতে দেরি হচ্ছে।
আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (IPP) হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে।
৩. অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হ্রাস
৪. লোডশেডিং ও গ্রীষ্মের উচ্চ চাহিদা
৫. অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি।

যদিও এই সংকট মোকাবিলায় সরকার বর্তমানে সারা দেশে সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন করছে
এসি-র তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির নিচে না রাখতে
অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করা।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস সময় পুনর্বিন্যাস করা।

আসলে সংকটের মূল কারণ ও প্রতিকারের অভাব বিশেষজ্ঞরা ডলার সংকট, বকেয়া বিল এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হ্রাসকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও সমাধান প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বা স্বস্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
বকেয়া বিল ও অব্যবস্থাপনা, জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের সংস্থান করতে না পারা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের বিপুল বকেয়া জমে থাকা সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবকে স্পষ্ট করে।

দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি কেবল আন্তর্জাতিক ইস্যু কিংবা একটি যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ব পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বিভিন্ন সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও, মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব এবং যৌক্তিকতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে।

লোডশেডিংয়ের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার না করে, অভ্যন্তরীণ সংকট ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। যখন দেশের বড় একটি অংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে, তখন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের এমন দায়সারা বক্তব্য ও চ্যালেঞ্জ জনগণের ভোগান্তি নিয়ে তামাশা করারই শামিল।

যুগ যুগ ধরে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতায় এসে আবার ‘অন্ধকার হারিকেন’ আঁকড়ে ধরা কেবল একটি সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন। সরকার যদি কেবল জনগণের ওপর বোঝা না চাপিয়ে জ্বালানি খাতের দুর্নীতি রোধ, দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি এবং ভিআইপি কালচার ত্যাগ করে সুষম বণ্টনে মনোযোগী না হয়, তবে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সম্ভব হবে না। কেবলমাত্র স্বচ্ছতা এবং সঠিক পরিকল্পনাই পারে এই অন্ধকার থেকে জাতিকে আলোর পথে এগিয়ে নিতে।

মিসবাহ উদ্দীন আহমেদ
নিউইয়র্ক।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।

স্মরণকালের ভয়াবহ লোডশেডিং: দায় কার এবং মন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা

স্মরণকালের ভয়াবহ লোডশেডিং: দায় কার এবং মন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা

আপডেট সময় ০৯:৩১:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

বর্তমান দেশের প্রতিমান লোডশেডিংয়ের এই সময়ে গ্রামবাংলার সেই পুরনো দৃশ্যগুলো যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে। হারিকেন, কুপির আলো আর রেশনের কেরোসিনের সেই পরিচিত গন্ধ—যা এক সময় আমাদের ঐতিহ্যের অংশ ছিল—তা এখন নিরুপায় হয়েই ফিরে আসছে।
একটা সময় ছিল যখন হারিকেন মোছা বা সলতে ঠিক করা ছিল সন্ধ্যার নিয়মিত কাজ। বিদ্যুৎ আসার পর আমরা এগুলোকে স্টোররুমে বা শোপিস হিসেবে তুলে রেখেছিলাম। এখন লোডশেডিংয়ের দীর্ঘ প্রহর সেই পুরনো ‘বন্ধুদের’ আবার ধুলো ঝেড়ে বের করতে বাধ্য করছে।

গ্রামে একসময় রেশনের কেরোসিন তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ানো ছিল খুব সাধারণ দৃশ্য। বর্তমানের এই লোডশেডিংয়ের দাপটে মানুষ আবার সেই দিনগুলোর কথা ভাবছে। হারিকেনের সেই মৃদু হলুদ আলো যেমন এক ধরণের মায়া তৈরি করে, তেমনি বিদ্যুৎহীন গরমে সেটি বেশ কষ্টদায়কও বটে।
দেশে মফস্বল এরিয়াতে দিনের ১৬-১৭ ঘন্টা করে লোডশেডিং বাস্তবতা নিজে দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে‌। অভ্যাস পরিবর্তন করে আবারও পুরাতন অভ্যাসের দিকে ধাবিত করা যে কতটা কষ্টসাধ্য হয় এখন মফস্বলের প্রত্যেকটা মানুষ আড়ে আড়ে উপলব্ধি করছে।
কারণ গ্রামের এই সহজ সরল পরিবেশটাকে আধুনিক গ্রামের মানুষ এখন বিদ্যুতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যেমন–
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা: হারিকেনের আলোয় আগের মতো মন বসানো বর্তমান প্রজন্মের জন্য বেশ কঠিন।
কৃষিকাজ: সেচ ব্যবস্থার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা এখন অপরিহার্য।
যোগাযোগ: স্মার্টফোন চার্জ দেওয়ার জন্য হলেও এখন মানুষ বিদ্যুতের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে।

বর্তমানে দেশজুড়ে যে ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে, তা জন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এই সংকটের প্রকৃত কারণ কী? সরকার আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বা ইরানের হরমোজ প্রণালীর অস্থিরতাকে দায়ী করছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন—এটি কি কেবলই বৈশ্বিক সংকট, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা আর আমলাতান্ত্রিক অস্বচ্ছতা?
জাতির সাথে কি কোনো লুকোচুরি বা প্রতারণা করা হচ্ছে?

সম্প্রতি সরকারের একজন মন্ত্রী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, কেউ লোডশেডিং প্রমাণ করতে পারলে তিনি পদত্যাগ করবেন!
তার এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে একটি নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। মন্ত্রীর এই দাবি তার নিজ অভিজ্ঞতায় হয়তো সত্য। কারণ, মন্ত্রীরা যে অভিজাত এলাকায় বসবাস করেন, সেখানে লোডশেডিং কল্পনা করাও কঠিন। সংসদ ভবন, মন্ত্রিপাড়া কিংবা তাদের কর্মস্থলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হয়। এমনকি মন্ত্রীরা যখন কোনো এলাকায় সফরে যান, তখন সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে অন্ধকার আর অসহ্য গরমের যে বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দেখছে, তা মন্ত্রীদের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছায় না।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন লোডশেডিং যদি নাই থাকে তাহলে আইনের কড়াকড়ি কেন?
বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে সরকার দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭টার পর মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধের কঠোর আইন করেছে। আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানাও গুনতে হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের। অথচ বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের মফস্বল ও শহরগুলোতে ব্যবসার মূল সময় শুরু হয় বিকেলে। অফিস আদালত কাজ শেষ করে মাগরিবের নামাজের পর কেনাকাটা করতেন।
দোকানপাটের মালিকরা যদি ব্যবসা-বাণিজ্য না করতে পারে তাহলে কি করে তারা কর্মচারীর বেতন পরিশোধ করবেন কিংবা দোকানের মালিক ভাড়া পরিশোধ করবে?
সর্বসাধারণের আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে এই অল্প সময়ে ব্যবসা করে দোকান মালিকরা কীভাবে উচ্চ হারে দোকানের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবেন? যদি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই মূল লক্ষ্য হয়, তবে দিনের বেলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করার পরও কেন রাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে? এটি ক্ষুদ্র অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল।
একদিকে বিদ্যুৎ নেই বলে মানুষের রুটি-রুজির পথ সংকুচিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে বলা হচ্ছে লোডশেডিং নেই—এই দ্বিমুখী অবস্থান জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে জ্বালানি সংকটের জন্য নিম্নের কিছু কারণ সংকটের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন যেমন–
১. মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আমদানি সরবরাহ ব্যাহত যেমন হরমুজ প্রণালী বন্ধ,
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর আমদানি-নির্ভরতা। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৯৫% জ্বালানি (গ্যাস, কয়লা ও তেল) আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গত এক দশকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করায় আজ বিশ্ববাজারের ওপর আমাদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার সংকট অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীর প্রধান অন্যতম কারণ

২. তীব্র ডলার সংকট বিপুল বকেয়া ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি: সরকারের বড় একটি ব্যর্থতা হলো ডলার ম্যানেজমেন্ট। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে:
এলএনজি (LNG) এবং কয়লা আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (LC) খুলতে দেরি হচ্ছে।
আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (IPP) হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে।
৩. অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হ্রাস
৪. লোডশেডিং ও গ্রীষ্মের উচ্চ চাহিদা
৫. অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি।

যদিও এই সংকট মোকাবিলায় সরকার বর্তমানে সারা দেশে সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন করছে
এসি-র তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির নিচে না রাখতে
অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করা।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস সময় পুনর্বিন্যাস করা।

আসলে সংকটের মূল কারণ ও প্রতিকারের অভাব বিশেষজ্ঞরা ডলার সংকট, বকেয়া বিল এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হ্রাসকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও সমাধান প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বা স্বস্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
বকেয়া বিল ও অব্যবস্থাপনা, জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের সংস্থান করতে না পারা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের বিপুল বকেয়া জমে থাকা সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবকে স্পষ্ট করে।

দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি কেবল আন্তর্জাতিক ইস্যু কিংবা একটি যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ব পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বিভিন্ন সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও, মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব এবং যৌক্তিকতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে।

লোডশেডিংয়ের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার না করে, অভ্যন্তরীণ সংকট ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। যখন দেশের বড় একটি অংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে, তখন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের এমন দায়সারা বক্তব্য ও চ্যালেঞ্জ জনগণের ভোগান্তি নিয়ে তামাশা করারই শামিল।

যুগ যুগ ধরে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতায় এসে আবার ‘অন্ধকার হারিকেন’ আঁকড়ে ধরা কেবল একটি সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন। সরকার যদি কেবল জনগণের ওপর বোঝা না চাপিয়ে জ্বালানি খাতের দুর্নীতি রোধ, দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি এবং ভিআইপি কালচার ত্যাগ করে সুষম বণ্টনে মনোযোগী না হয়, তবে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সম্ভব হবে না। কেবলমাত্র স্বচ্ছতা এবং সঠিক পরিকল্পনাই পারে এই অন্ধকার থেকে জাতিকে আলোর পথে এগিয়ে নিতে।

মিসবাহ উদ্দীন আহমেদ
নিউইয়র্ক।


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/somokontho/public_html/wp-includes/functions.php on line 5481