ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের দুই প্রান্তে অবস্থান হলেও ইউক্রেন ও ইরানের চলমান যুদ্ধ ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলার মতো বিষয় মিলিয়ে দুটি সংঘাতকে এখন আলাদা করে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। ফলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতার এক বিস্তৃত বলয় তৈরি হচ্ছে, যা অন্যান্য দেশগুলোকেও এই সংঘাতে টেনে আনার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানের সম্পৃক্ততা ছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর রাশিয়া তেহরানকে গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা এবং ড্রোন সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক এক সফরে তিনি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সঙ্গে ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ বিষয়ে চুক্তি ও জর্ডানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে ইউক্রেন নিজেকে শুধু সহায়তা গ্রহণকারী নয়, বরং প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবেও তুলে ধরছে।
চলমান এ দুই যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জ্বালানি বাজারে। ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ফলশ্রুতিতে তেহরানের হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের পদক্ষেপের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এতে লাভবান হয়েছে রাশিয়া। জ্বালানির বাড়তি চাহিদা দেশটির অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে থেকেও টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির বাজেট কাটছাঁটের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে।
বিশ্ববাজার স্থিতিশীল রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো রুশ তেল কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধের বদৌলতে পাওয়া রাশিয়ার এই আর্থিক সুবিধা সীমিত করতে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা জোরদার করেছে ইউক্রেন। রয়টার্সের এক হিসাবে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
চলমান এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় দেশগুলোও। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে ইউরোপেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছে তারা। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি ইরানের ড্রোন কৌশলের পেছনে রাশিয়ার ‘গোপন হাত’ থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কালাস বলেছেন, ‘এই যুদ্ধগুলো স্পষ্টভাবেই পরস্পর সংযুক্ত।’ তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামাতে চায়, তাহলে ইরানকে সহায়তা বন্ধে রাশিয়ার ওপরও চাপ বাড়াতে হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এখনও এ দুই যুদ্ধকে আলাদা করেই দেখছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানে রাশিয়ার ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে প্রভাব ফেলছে না। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন এখনও মস্কোর প্রতি তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে।
এদিকে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা কমাতে চাপ দিচ্ছে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ইউরোপ সহায়তা না করলে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া যতদিন ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবে, ততদিন পাল্টা হামলাও চলবে।
রাশিয়ার জন্য ইরানকে সহায়তা দেওয়া কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় সিরিয়ার নেতা বাশার আল-আসাদ ও ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর মতো মিত্রদের হারিয়েছে মস্কো। ফলে ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে তারা নতুন করে নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে চাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ এখন একটি বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক সংকটের অংশ হয়ে উঠছে। এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বিশ্ব রাজনীতির সামগ্রিক গতিপথকেই নতুনভাবে নির্ধারণ করছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

নিজস্ব সংবাদ : 



























