ঢাকা ০৫:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টোল আদায়ের যুদ্ধ, হুমকিতে মুক্ত সমুদ্র ও বিশ্ব বাণিজ্য

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৪:৪৮:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা হ্রাস এবং তাদের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল এই সংঘাত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধ এখন মূলত হরমুজ প্রণালি দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এটি জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের মতো অতি প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের একটি বৈশ্বিক করিডোর। এটি স্থায়ীভাবে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে মুক্ত সমুদ্রে অবাধ যাতায়াতের বহু বছরের আন্তর্জাতিক নিয়মটি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।

সিএনএনের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এই প্রণালিকে বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। এখন এই জলপথ দিয়ে চলাচল করতে হলে জাহাজগুলোকে ইরানের নবগঠিত পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে। অন্যথায় ইরানি বাহিনীর হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকছে।

গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৬০ দিনের এক সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর সাময়িকভাবে টোল আদায় বন্ধ থাকলেও, প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমেনি। উল্টো তারা এমওইউর একটি নির্দিষ্ট ধারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিচ্ছে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক পর্যায়ে ঘোষণা করেছিলেন, প্রণালিতে মার্কিন সুরক্ষার জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ২০ শতাংশ ফি দিতে হবে। যদিও ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তবে তাঁর এই হুমকি পরোক্ষভাবে ইরানের টোল আদায়কেই আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দিয়ে ফেলেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যমে উপহাস করে লিখেছেন, ‘২০ শতাংশ সত্যিই অনেক বেশি। আমরা অন্তত ন্যায্য টোল আদায় করব।’

টোল আদায়ের বহুমুখী সমস্যা

হরমুজ প্রণালিতে যদি টোল প্রথা স্থায়ী রূপ নেয়, তবে বিশ্বজুড়ে জাহাজ ভাড়া ও পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে। তথ্যমতে, ইরান প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য এক থেকে দুই ডলার পর্যন্ত টোল আদায় করছে, যা একটি বড় ট্যাঙ্কারের জন্য প্রায় ২০ লাখ ডলার।

তবে অর্থনৈতিক খরচের চেয়েও বড় সমস্যা হলো বীমা সুবিধা। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো জাহাজ যদি কালো তালিকাভুক্ত ইরানি সংস্থাকে টোল দেয়, তবে বীমা কোম্পানিগুলো সেই জাহাজের বীমা বাতিল করবে। এমনকি ওমানের মতো কোনো নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ দিয়েও যদি এই ফি আদায় করা হয়, তাহলেও তা জাতিসংঘের সমুদ্র আইন লঙ্ঘন করবে। ফলে সমুদ্রযাত্রাগুলো বীমা সুরক্ষার বাইরে চলে যাবে, যা বাণিজ্যকে স্থবির করে দিতে পারে।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, হরমুজের এই টোল ব্যবস্থা যদি একবার চালু হয়ে যায়, তবে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান জলপথ যেমন মালাক্কা, জিব্রাল্টার বা তাইওয়ান প্রণালি সংলগ্ন দেশগুলোও নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে অর্থ আদায় শুরু করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের ১০টি প্রধান জলপথ যদি এভাবে অর্থ আদায় শুরু করে, তবে বছরে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি। এর ফলে বিশ্ব হয়ে উঠবে আরও বেশি বিভক্ত, সামরিকীকরণ এবং চরমভাবে মূল্যস্ফীতি জর্জরিত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

টোল আদায়ের যুদ্ধ, হুমকিতে মুক্ত সমুদ্র ও বিশ্ব বাণিজ্য

আপডেট সময় ০৪:৪৮:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা হ্রাস এবং তাদের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল এই সংঘাত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধ এখন মূলত হরমুজ প্রণালি দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এটি জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের মতো অতি প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের একটি বৈশ্বিক করিডোর। এটি স্থায়ীভাবে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে মুক্ত সমুদ্রে অবাধ যাতায়াতের বহু বছরের আন্তর্জাতিক নিয়মটি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।

সিএনএনের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এই প্রণালিকে বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। এখন এই জলপথ দিয়ে চলাচল করতে হলে জাহাজগুলোকে ইরানের নবগঠিত পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে। অন্যথায় ইরানি বাহিনীর হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকছে।

গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৬০ দিনের এক সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর সাময়িকভাবে টোল আদায় বন্ধ থাকলেও, প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমেনি। উল্টো তারা এমওইউর একটি নির্দিষ্ট ধারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিচ্ছে।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক পর্যায়ে ঘোষণা করেছিলেন, প্রণালিতে মার্কিন সুরক্ষার জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ২০ শতাংশ ফি দিতে হবে। যদিও ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তবে তাঁর এই হুমকি পরোক্ষভাবে ইরানের টোল আদায়কেই আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দিয়ে ফেলেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যমে উপহাস করে লিখেছেন, ‘২০ শতাংশ সত্যিই অনেক বেশি। আমরা অন্তত ন্যায্য টোল আদায় করব।’

টোল আদায়ের বহুমুখী সমস্যা

হরমুজ প্রণালিতে যদি টোল প্রথা স্থায়ী রূপ নেয়, তবে বিশ্বজুড়ে জাহাজ ভাড়া ও পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে। তথ্যমতে, ইরান প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য এক থেকে দুই ডলার পর্যন্ত টোল আদায় করছে, যা একটি বড় ট্যাঙ্কারের জন্য প্রায় ২০ লাখ ডলার।

তবে অর্থনৈতিক খরচের চেয়েও বড় সমস্যা হলো বীমা সুবিধা। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো জাহাজ যদি কালো তালিকাভুক্ত ইরানি সংস্থাকে টোল দেয়, তবে বীমা কোম্পানিগুলো সেই জাহাজের বীমা বাতিল করবে। এমনকি ওমানের মতো কোনো নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ দিয়েও যদি এই ফি আদায় করা হয়, তাহলেও তা জাতিসংঘের সমুদ্র আইন লঙ্ঘন করবে। ফলে সমুদ্রযাত্রাগুলো বীমা সুরক্ষার বাইরে চলে যাবে, যা বাণিজ্যকে স্থবির করে দিতে পারে।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, হরমুজের এই টোল ব্যবস্থা যদি একবার চালু হয়ে যায়, তবে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান জলপথ যেমন মালাক্কা, জিব্রাল্টার বা তাইওয়ান প্রণালি সংলগ্ন দেশগুলোও নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে অর্থ আদায় শুরু করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের ১০টি প্রধান জলপথ যদি এভাবে অর্থ আদায় শুরু করে, তবে বছরে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি। এর ফলে বিশ্ব হয়ে উঠবে আরও বেশি বিভক্ত, সামরিকীকরণ এবং চরমভাবে মূল্যস্ফীতি জর্জরিত।