ঢাকা ০৭:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস Logo দিল্লিতে বসে হুংকার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী Logo ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা ৭৯ শতাংশ মার্কিনির Logo ফ্রান্সকে বিদায় করে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন Logo স্পেনকে পেনাল্টি দেওয়াটা কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল? Logo ৯৮ হাজার টাকায় হজযাত্রী পরিবহনের প্রস্তাব ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের Logo নারায়ণগঞ্জে বিদেশি পিস্ত\লসহ গ্রেপ্তার যুবক Logo ফ্রান্স ও স্পেনের শুরুর একাদশে কারা আছেন Logo ‘ফকল্যান্ড নয়, ফুটবলে মনোযোগ দিন’- ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে বললেন আর্জেন্টাইন যোদ্ধারা Logo শিক্ষামন্ত্রীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর

৫২৭ কোটি টাকার স্থায়ী বাঁধে দেড় মাসেই ধস

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ১১:৩৩:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

নদীভাঙনের চিরচেনা আতঙ্ক কাটিয়ে একটু নিশ্চিন্তে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন পদ্মাপাড়ের মানুষ। ভেবেছিলেন, বাপ-দাদার রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকু আর হয়তো নদীগর্ভে বিলীন হবে না। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাত্র দেড় মাসের মাথায় ভাঙতে শুরু করেছে। প্রায় ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদী তীর রক্ষা বাঁধের মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নে একটি অংশে পদ্মার প্রবল স্রোতে ধস নেমেছে।

বাঁধের সিসি ব্লক একের পর এক সরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় নতুন করে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো রাতে ঘুমাতে পারছেন না উৎকণ্ঠায়। অনেকেই নিরাপত্তার খাতিরে ইতোমধ্যে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেলে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে নদী তীর রক্ষা বাঁধে হঠাৎ ধস দেখা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী কাজী বাবুল জানান, কোনো প্রকার সংকেত বা পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই নদীর তীব্র স্রোতে সিসি ব্লকগুলো একের পর এক পদ্মায় তলিয়ে যেতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাগর আক্ষেপ করে বলেন, বিকেলে হঠাৎ দেখি বাঁধের ব্লক ভেঙে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। ভয়ে রাতেই ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

একই আক্ষেপ শোনা গেল ৩০ বছর আগে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো আব্দুল লতিফ খানের কণ্ঠে। তিনি বলেন, বাঁধ হওয়ার পর ভেবেছিলাম এবার অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারব। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যে যদি বাঁধে এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? একই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা রিতা রাণী দে ও মনির চন্দ্র দে।

ওই এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মো. শওকত হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন নদীভাঙনের ভয় নিয়ে বসবাস করেছি। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পর মনে হয়েছিল এবার হয়তো শান্তিতে বসবাস করা যাবে। কিন্তু দেড় মাসের মাথায় যদি বাঁধ ধসে পড়ে, তাহলে মানুষের ভরসা থাকবে কোথায়?

যে বাঁধকে ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, এত অল্প সময়ের মধ্যে তা কীভাবে ধসে পড়ল— তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাঁধের নির্মাণকাজে চরম গাফিলতি বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি ব্লক বসিয়ে সাময়িক সমাধান করলেই হবে না; বাঁধের মূল নকশা, নির্মাণকাজের মান এবং ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত মান নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। এখনই স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে গাঁওদিয়া বাজারসহ আশপাশের বিস্তর্ণ এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

ঘটনার পরদিন সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু। তিনি জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ধস নামার খবর পেয়ে রাতেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা উপস্থিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, খবর পাওয়ার পর থেকেই পাউবো দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে ভয়ের কোনো কারণ নেই।

উল্লেখ্য, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২১ সালের অক্টোবরে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদের সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়। ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দে ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজের শুরু থেকেই ধীরগতির অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের। বর্ষার শুরুতেই স্থায়ী বাঁধের এমন ধসে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দ্রুত ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস

৫২৭ কোটি টাকার স্থায়ী বাঁধে দেড় মাসেই ধস

আপডেট সময় ১১:৩৩:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

নদীভাঙনের চিরচেনা আতঙ্ক কাটিয়ে একটু নিশ্চিন্তে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন পদ্মাপাড়ের মানুষ। ভেবেছিলেন, বাপ-দাদার রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকু আর হয়তো নদীগর্ভে বিলীন হবে না। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাত্র দেড় মাসের মাথায় ভাঙতে শুরু করেছে। প্রায় ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদী তীর রক্ষা বাঁধের মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নে একটি অংশে পদ্মার প্রবল স্রোতে ধস নেমেছে।

বাঁধের সিসি ব্লক একের পর এক সরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় নতুন করে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো রাতে ঘুমাতে পারছেন না উৎকণ্ঠায়। অনেকেই নিরাপত্তার খাতিরে ইতোমধ্যে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেলে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে নদী তীর রক্ষা বাঁধে হঠাৎ ধস দেখা দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী কাজী বাবুল জানান, কোনো প্রকার সংকেত বা পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই নদীর তীব্র স্রোতে সিসি ব্লকগুলো একের পর এক পদ্মায় তলিয়ে যেতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাগর আক্ষেপ করে বলেন, বিকেলে হঠাৎ দেখি বাঁধের ব্লক ভেঙে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। ভয়ে রাতেই ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

একই আক্ষেপ শোনা গেল ৩০ বছর আগে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো আব্দুল লতিফ খানের কণ্ঠে। তিনি বলেন, বাঁধ হওয়ার পর ভেবেছিলাম এবার অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারব। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যে যদি বাঁধে এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? একই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা রিতা রাণী দে ও মনির চন্দ্র দে।

ওই এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মো. শওকত হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন নদীভাঙনের ভয় নিয়ে বসবাস করেছি। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পর মনে হয়েছিল এবার হয়তো শান্তিতে বসবাস করা যাবে। কিন্তু দেড় মাসের মাথায় যদি বাঁধ ধসে পড়ে, তাহলে মানুষের ভরসা থাকবে কোথায়?

যে বাঁধকে ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, এত অল্প সময়ের মধ্যে তা কীভাবে ধসে পড়ল— তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাঁধের নির্মাণকাজে চরম গাফিলতি বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি ব্লক বসিয়ে সাময়িক সমাধান করলেই হবে না; বাঁধের মূল নকশা, নির্মাণকাজের মান এবং ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত মান নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। এখনই স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে গাঁওদিয়া বাজারসহ আশপাশের বিস্তর্ণ এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

ঘটনার পরদিন সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু। তিনি জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ধস নামার খবর পেয়ে রাতেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা উপস্থিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, খবর পাওয়ার পর থেকেই পাউবো দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে ভয়ের কোনো কারণ নেই।

উল্লেখ্য, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২১ সালের অক্টোবরে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদের সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়। ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দে ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজের শুরু থেকেই ধীরগতির অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের। বর্ষার শুরুতেই স্থায়ী বাঁধের এমন ধসে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দ্রুত ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।