শুধু ফুটবল ম্যাচ নয়, জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের প্রার্থনা, একজন কিংবদন্তির শেষ স্বপ্ন আর একটি ছোট্ট দেশের ইতিহাস বদলে দেওয়ার সাহস। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বিজয়ীর হাসি ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে, আর পরাজিত দলের চোখের জল হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। বাঁশি শুধু ম্যাচের সমাপ্তির সঙ্গে যুগেরও অবসান ঘটায়।
বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৭টায় বিশ্বকাপের শেষ কোয়ার্টার-ফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপের শক্তি সুইজারল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির ঐতিহাসিক ক্যানসাস সিটি স্টেডিয়াম হবে এই মহারণের মঞ্চ। প্রায় ৭৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়াম বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ গ্যালারিগুলোর একটি। সেই গর্জনের মাঝেই নির্ধারণ হবে, কারা পা রাখবে বিশ্বকাপের শেষ চারের মঞ্চে। লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ অভিযানের আরেকটি সোনালি অধ্যায়, নাকি সুইজারল্যান্ড লিখবে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপকথা?
আর্জেন্টিনা মানেই আবেগ, বিশ্বাস আর লড়াইয়ের গল্প। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পরও আলবিসেলেস্তেদের ক্ষুধা ফুরিয়ে যায়নি। কোচ লিওনেল স্কালোনির দল এবারও সেই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পথে। রক্ষণে দৃঢ়তা, মাঝমাঠে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ আর আক্রমণে মেসির জাদুতে আর্জেন্টিনা শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার। সব আলো ঘুরেফিরে লিওনেল মেসির ওপরই পড়েছে।
মেসির শেষ বিশ্বকাপ। বয়স ৩৯ হলেও তার বাঁ পায়ের জাদু এখনও প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। একটি ফ্রি-কিক, একটি থ্রু পাসেই বদলে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য। কোটি মানুষের কাছে মেসি এক প্রজন্মের অনুভূতি, এক দেশের বিশ্বাস।
মেসির পাশে এখন আছেন হুলিয়ান আলভারেজের ক্ষুধার্ত দৌড়, এনজো ফার্নান্দেজের বুদ্ধিদীপ্ত পাস, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ছন্দ, রদ্রিগো ডি পলের নিরলস পরিশ্রম এবং গোলবারের নিচে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের অদম্য আত্মবিশ্বাস। মার্তিনেজ আর্জেন্টিনাকে বাড়তি সাহস দিচ্ছেন। টাইব্রেকারের কথা উঠলেই প্রতিপক্ষের মনে আলাদা চাপ তৈরি হয়।
ম্যাচের আগে স্কালোনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘বিশ্বকাপের শেষ আটে কোনো প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সুইজারল্যান্ড অত্যন্ত সংগঠিত একটি দল। তারা খুব কম ভুল করে। আমাদের নিজেদের সেরাটা খেলতে হবে।’
আর্জেন্টিনা শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত জয় তুলে নিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
সুইজারল্যান্ড কখনও বিশ্বকাপের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না। তাদের দলে হয়ত মেসির মতো কিংবদন্তি নেই, নেই কোটি ভক্তের আবেগ। আছে শৃঙ্খলা, পরিশ্রম আর দলগত ফুটবলের অসাধারণ এক দর্শন। বছরের পর বছর ধরে বড় দলগুলোর জন্য অস্বস্তির নাম হয়ে আছে সুইসরা। বিশ্বকাপেও তারা নীরবে এসেছে, মাঠে নিজেদের পরিচয় দিয়েছে জোরালোভাবে। আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেই তারা শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে।
কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেন, ‘আর্জেন্টিনা অসাধারণ দল, তারা অজেয় নয়। আমরা তাদের সম্মান করি, ভয় পাই না। বিশ্বকাপে এমন ম্যাচ খেলার জন্যই আমরা প্রস্তুতি নিই।’ তার কথা, ‘আবেগ দিয়ে নয়, নিখুঁত পরিকল্পনা দিয়েই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারাতে হবে। খেলোয়াড়দের ভয়মুক্ত থেকে নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে হবে।’
ইতিহাস আর্জেন্টিনার পক্ষেই কথা বলে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দল একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছে। জয়ের পাল্লা ভারী আর্জেন্টিনার। সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইটি হয়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয়। নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে আনহেল দি মারিয়ার একমাত্র গোলে জিতে কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাঁপিয়ে রেখেছিল সুইজারল্যান্ড। বারো বছর পর আবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দুই দলের দেখা। পুরোনো সেই স্মৃতি কি আবার ফিরবে? নাকি এবার বদলে যাবে ইতিহাস?
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বড় বড় বিস্ময়ের জন্ম হয়েছে নকআউট পর্বেই। মরক্কো, ক্রোয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সেনেগাল প্রমাণ করেছে, সাহস থাকলে অসম্ভবও সম্ভব। সুইজারল্যান্ডও বিশ্বাস করে, এবার সেই তালিকায় নিজেদের নাম লেখানোর সময় এসেছে।
মাঝমাঠের লড়াইটিই হতে পারে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী। এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টার ও ডি পল যদি খেলার ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, তাহলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকবে। গ্রানিত জাকা যদি নিজের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেন, তবে সুইজারল্যান্ডও সমান বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সামনে ব্রিল এমবোলোর গতি এবং ড্যান এনডয়ের দৌড় আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখতেই পারে।
পুরো নব্বই মিনিট একজন মেসিকে আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব। হয়ত তিনি পুরো ম্যাচে মাত্র কয়েকবার বল ছুঁবেন, সেই কয়েকটি মুহূর্তই ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিতে পারে।
হয়ত আজ আবারও মেসির বাঁ পা লিখবে নতুন এক মহাকাব্য। হয়ত এমিলিয়ানো মার্তিনেজ হয়ে উঠবেন আর্জেন্টিনার ত্রাতা। কিংবা গ্রানিত জাকার নেতৃত্বে সুইজারল্যান্ড ঘটিয়ে দেবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি। শেষ বাঁশি বাজবে। তারপর একটি দেশের আকাশ ভরে উঠবে নীল-সাদা পতাকার উল্লাসে, অথবা লাল-সাদা পতাকার নতুন ইতিহাসে। অন্য দেশটি নীরবে গুটিয়ে নেবে তার স্বপ্ন। বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচ একটি উপন্যাস, আর প্রতিটি বিজয় ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।

নিজস্ব সংবাদ : 




























