গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে যাত্রীবোঝাই বাসডুবির তৃতীয় দিনে গতকাল শুক্রবার উদ্ধারকাজ পরিচালনা করেছে ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড। তবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনো মৃতদেহের সন্ধান মেলেনি। এ দুর্ঘটনায় রিপন শেখ নামে একজন নিখোঁজ বলে দাবি করেছে তাঁর পরিবার।
হৃদয়বিদারক এ দুর্ঘটনার পেছনে ফেরিঘাটে অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা। এ ছাড়া বুধবার দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। স্থানীয়রা বলছেন রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক, ফেরিতে আগে উঠতে যানবাহনগুলোর প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাসহ নানা কারণে ঘাটটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এদিকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িক স্থগিত করেছে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধার কার্যক্রমে প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিরতি ছিল। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় আবার কাজ শুরু করে উদ্ধারকারী দল। বালিয়াকান্দি উপজেলার রিপনের পরিবারের দাবি, রাজবাড়ী নতুন বাজার এলাকা থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে উঠেছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। গোয়ালন্দ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. সোহেল রানা জানান, রিপনকে উদ্ধারে গতকাল সারাদিন ডুবুরি দল দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাট এলাকা ও এর আশপাশে অভিযান চালায়।
ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে ওঠানামা করে যানবাহন
ফেরিঘাটে সংযোগ সড়কের শেষে নদীতীরে পন্টুন বাঁধা থাকে। এই পন্টুনের ওপর দিয়েই ফেরিতে যানবাহন ওঠানামা করে। ৩ নম্বর ঘাটে পুরোনো ও আকারে ছোট পন্টুনটিতে লোহার রেলিং বা নিরাপত্তাবেষ্টনী মাত্র ১ ফুট উঁচু। যাত্রী ও যানবাহনকে ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে ওঠানামা করতে হয়। দৌলতদিয়ার অন্য ঘাটগুলোরও একই চিত্র।
দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটে মূল সড়ক থেকে পন্টুন পর্যন্ত সংযোগ সড়কগুলো অনেক ঢালু। এ ছাড়া সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা। এতে যাত্রী ও মালপত্র নিয়ে যানবাহনগুলোকে ফেরিতে ওঠানামা করতে বেগ পেতে হয়। মাঝেমধ্যে সংযোগ সড়কে যানবাহন আটকে যায়।
সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পেছনে ঘাট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, ঘাট পার হতে আসা যানবাহন পন্টুনে ওঠার আগে সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। ঘাটে আসা ফেরি থেকে সব যানবাহন নেমে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠবে। দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ওইদিন হাসনাহেনা নামের ফেরিটি ঘাটে এসে পৌঁছাতেই সংযোগ সড়ক থেকে চলতে শুরু করেছিল বাসটি। পরে সেটি সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
মাগুরা থেকে ঢাকা রুটে চলাচলকারী দিগন্ত পরিবহনের একটি বাসের সুপারভাইজার সাইদুল ইসলাম বলেন, ফেরিঘাটের পন্টুনে কোনো রেলিং নেই। থাকলে বুধবার ওই বাসটি নদীতে পড়ে যেত না।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে জানান, পন্টুনগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে রেলিং আরও শক্তিশালী করা হবে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। এ ছাড়া তাদের কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাত্রী নামিয়ে শুধু চালক বাস নিয়ে ফেরিতে উঠবেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাত্রী নিরাপত্তা বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখা হবে। যারা ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনায় জড়িত, তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
উদ্ধারকাজ নিয়ে ক্ষোভ
সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকাজ শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় স্থানীয়রা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা কাছেই থাকলেও দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেনি। স্থানীয় উত্তেজিত লোকজন দুর্ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে উদ্ধারকারী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল। সেনাবাহিনী, র্যা ব ও পুলিশ দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলম বলেন, ‘উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা দৌলতদিয়া ঘাটেই ছিল। তবে অভিযানের জন্য জরুরি কিছু প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। প্রস্তুতি গ্রহণ করে আমাদের লোকজন দ্রুত সময়ের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু ঢাকা থেকে ডুবুরি আনতে হয়েছে। এরপর ডুবে যাওয়া বাসটি শনাক্ত করে মূল উদ্ধার কাজ শুরু করা হয়। কম সময়ের মধ্যেই তা উদ্ধার করা হয়।’
নানা প্রশ্ন এখনও
ঢাকার উদ্দেশে বাসটি যাত্রা শুরু করেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে। দুর্ঘটনার সময় ৪৬ আসনের বাসটিতে কতজন যাত্রী ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের কয়েকজন বলেছেন, সব সিটে যাত্রী ছিল। ইঞ্জিন কভারে তিনজন যাত্রী বসেছিল। কিছু যাত্রীর কোলে শিশু ছিল। বাসটি দৌলতদিয়া ঘাটে এসে দাঁড়ালে কিছু যাত্রী নেমে যায়। এই সংখ্যা কত, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। এর মধ্যে ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১০ জনকে। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন তিনজন।
গোয়ালন্দ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানান, একজন নিখোঁজ বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্বজনরা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি, তিনি ওই বাসেই উঠেছেন। শনিবার (আজ) সকালে আবারও উদ্ধারকাজ শুরু হবে।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে আর্থিক সহায়তা দিলেন ডিসি
বাসডুবিতে নিহত ২৬ জনের মধ্যে রাজবাড়ী জেলার ১৮ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার রাতে জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার নিহতের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ২৫ হাজার টাকার চেক স্বজনদের হাতে তুলে দেন। এ সময় রাজবাড়ী সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নিরুপমা রায়সহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া আহত দুজনকে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। নিহত অন্য আটজনের টাকা সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক হস্তান্তর করবেন বলে জানা গেছে।
বাসের নিবন্ধন সাময়িক স্থগিত
সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটির (রাজবাড়ী-ব-১১-০০২৪) নিবন্ধন সাময়িক স্থগিত করেছে বিআরটিএ। গত বৃহস্পতিবার বিআরটিএ রাজবাড়ী সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মুহাম্মদ অহিদুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ কথা জানানো হয়েছে। চিঠির অনুলিপি বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি), পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং), রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ছয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
রেজিস্ট্রেশন সনদ, রুট পারমিট, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সনদ নিয়ে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কার্যালয়ে হাজির হয়ে বাসটির মালিককে নিবন্ধন কেন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে না– সে ব্যাপারে বক্তব্য পেশ করতে বলা হয়েছে। তা না হলে বাসটির নিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিলসহ মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন দিন ধরে নিখোঁজ রিপন
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির শ্যামসুন্দরপুর গ্রামের মৃত আব্দুল বারেক শেখের ছেলে রিপন শেখ (৪৫) তিন দিন ধরে নিখোঁজ। ইটভাটার শ্রমিক রিপন ঈদে বাড়ি যান। কাজের সন্ধানে ঢাকার উদ্দেশে তিনি বের হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ছোট বোন মুক্তা।
তিনি জানান, বুধবার দুপুর ২টার দিকে তাঁর দুই ভাই রিপন ও সুমন একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হন। সুমন তাঁকে জানিয়েছেন, সাড়ে ৩টার দিকে রাজবাড়ীর মুরগির খামার এলাকায় তারা পৌঁছান। এরপর সৌহার্দ্য পরিবহনে বাসে তুলে দেন। তাঁর কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বাসডুবির পর তারা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়েছেন। বিষয়টি তিনি ফায়ার সার্ভিসের রাজবাড়ী স্টেশনে জানিয়েছেন। ভাইয়ের সন্ধানে তিনি বৃহস্পতিবার সারাদিন দৌলতদিয়া ঘাটেই ছিলেন।

নিজস্ব সংবাদ : 























