ঢাকা ০২:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিচয়, আমাদের ঠিকানা: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী Logo খামেনিকে হত্যার নেপথ্যে ছিল ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এক সুপরিকল্পিত ছক Logo দেশে এখন ‘মামলা বাণিজ্য’ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে: রুমিন ফারহানা Logo অবসরের ২ বছর তবুও বাংলো ছাড়েননি সাবেক সচিব ওয়াছি উদ্দিন Logo কক্সবাজারে আসামী ধরতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু Logo ইরানের প্রেসিডেন্টকে ফোনকল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর, যে কথা হলো Logo প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে মনোযোগ দিতে বিএনপির পদ ছাড়লেন শাহে আলম Logo আমিনুল, জাইমা এবং আমাদের সংকীর্ণতার আয়না Logo ইসরাইল ও মার্কিন ঘাঁটিতে ৭৭তম বারের মতো হামলা ইরানের Logo বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে ৫ লিটার অকটেন উপহার

আমিনুল, জাইমা এবং আমাদের সংকীর্ণতার আয়না

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ১২:৩৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

জাইমা রহমানকে নিয়ে আমি এর আগে মাত্র একবারই লিখেছিলাম—২০২১ সালে, ফেইসবুকে। যখন শেখ হাসিনার মন্ত্রী ডা. মুরাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাইমাকে নিয়ে নোংরা আলোচনায় মেতে উঠেছিলো, তখন বিবেকবান কেউই নিশ্চুপ থাকতে পারেননি। আমিও পারিনি। সেই লেখায় আমি জাইমার ক্রীড়াপ্রীতি এবং দেশের প্রতি তার অনবদ্য ভালোবাসার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলাম।

সাধারণত ব্যক্তি-নির্ভর আলোচনা বা আচরণ নিয়ে আমি খুব কমই মতামত দিই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অপ্রয়োজনীয়ও মনে করি। তবে কিছু সময় আসে, যখন চুপ থাকাটাই অন্যায় হয়ে দাঁড়ায়। কাউকে অন্যায়ভাবে আক্রমণের শিকার হতে দেখলে বিবেক নিজে থেকেই সাড়া দেয়। তখন ব্যক্তি আমার ঘনিষ্ঠ কিনা, কিংবা তাকে খুশি করে কোনো লাভ আছে কি না—এসব বিবেচনা করি না। ভাবি শুধু ন্যায়-অন্যায়, দল ও দেশের কথা।

জাইমাকে প্রথম দেখি যখন তার বয়স ছিল আঠারো। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বসিত এক তরুণী। ঈদের সময় তাদের বাসায় আমাদের নিমন্ত্রণ থাকত। আর দশটা বাঙ্গালী মেয়ের মতো জাইমার স্বভাবটাও ছিলো সবাইকে আপন করে নেওয়ার। সে বড়দের আগ বাড়িয়ে সালাম করত, ছোটদের সঙ্গে মিশে যেত সহজেই। শিশুদের প্রতি ছিলো তার স্বাভাবিক মমতা, আমার মেয়ের প্রতিও।

এবার আসি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের প্রসঙ্গে। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি আমার পছন্দের ছিলেন। লম্বা সময় ধরে জাতীয় দলের থাকায় তার প্রতি আলাদা আকর্ষণও ছিল। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। সংসদ নির্বাচনে হেরে গেলেও মন্ত্রী হয়েছেন। ভদ্রতার দিক থেকে তার সুনাম আছে; তাই তাকে ভালো না লাগার কারণ নেই।

তবে আমার ও আমিনুল হকের রাজনীতি আলাদা। আমি কুটনীতি ও মানবাধিকার নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছি ইউরোপ-অ‍্যামেরিকায়। আর আমিনুল ভাই লড়াই করেছেন রাজপথে। অপ্রাসঙ্গিক শোনালেও বলি, হাসিনা রেজিমের পতনে অনেকেরই অবদান আছে। কিন্তু আমার মতো মানুষের ভূমিকা হয়তো আমজনতার কাছে অনুচ্চারিত। আপনাদের নিশ্চয়ই ছয় এমইপির চিঠির কথা মনে আছে। ২০২৩ সালের জুনে এই চিঠি যখন বাজারে আসে, তখন গোটা বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। টকশো, সেমিনার, বক্তৃতা, বিবৃতিতে তখন অন‍্যতম আলোচ‍নার বিষয় ছিলো ছয় এমইপির চিঠি, যাতে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে মধ‍্যরাতের নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবি করা হয়। কিন্তু লোকেরা জানে না এই চিঠি লিখিয়ে আনতে কতটা গলদঘর্ম হয়েছিলাম আমি ও লিংকনসহ আমাদের ফরেইন অ‍্যাফেয়ার্স টীম। আমরা যখন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধরনা দিচ্ছি, আমিনুল ভাইরা তখন জীবন বাজি রেখে মাঠে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছেন।

অর্থাৎ আমার ও আমিনুল হকের রাজনৈতিক জগত ভিন্ন। ফলে তার সাথে কখনো আন্তরিক সৌহার্দ্য বা যোগাযোগ গড়ে উঠেনি আমার। তবে রাজনীতির পথ আলাদা হলেও একজন খেলোয়াড় ও মানুষ হিসেবে আমিনুল হক আমার শ্রদ্ধার জায়গা অর্জন করেছেন।

সম্প্রতি আমিনুল হক এবং জাইমা রহমানকে ঘিরে সোশ‍্যাল মিডিয়া বেশ সরগরম। কারণ আমিনুল ভাই বলেছেন, জাইমা রহমান চেলসির মেয়েদের বয়সভিত্তিক দলে গোলকিপার হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ব‍্যস! এতেই হৈচৈ শুরু করে দিয়েছেন নেটিজেনরা। এতটুকু কথায় এত বিতর্ক—আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারি না। একটি গোষ্ঠী এআই দিয়ে ছবি বানিয়ে ‘ফুটবলার’ জাইমাকে প্রদর্শন করছে ফেইসবুকে। কিন্তু কেনো?

২০১৯ সালের জুন মাসে ওভালে বাংলাদেশ-নিউজিল‍্যান্ড ক্রিকেট ম‍্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন জাইমা রহমান। একই গ‍্যালারিতে আমিও ছিলাম। আমাদের দলের খেলোয়াড়রা চার-ছক্কা মারলে কিংবা প্রতিপক্ষের উইকেট ফেললে জাইমা যেভাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছিলো, তা মাঠের সবার নজর কাড়ে। শুধু ক্রীড়াপ্রমী হিসেবে নয়, সেদিন আমি চিনতে পেরেছিলাম দেশপ্রেমিক জাইমাকেও। সময়ের ব‍্যবধানে জাইমা রহমান এখন একজন ব‍্যারিস্টার, বিলেতের মেইনস্ট্রিম প্র‍্যাকটিশনার। গেলো ডিসেম্বরে বাবার সাথে দেশে ফিরে দ‍্যুতি ছড়াচ্ছেন রাজনীতির জটিল ময়দানে। মিশছেন সাধারণ মানুষের সাথে; বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেখাচ্ছেন সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। সালোয়ার-কামিজ, আবার ঈদের মতো বিশেষ দিনগুলোতে শাড়ি পরে, মার্জিত চলাফেরায় মানুষের মনোযোগ কাড়ছেন জাইমা। ফাঁকতালে স্টেডিয়ামে গেছেন বাংলাদেশের খেলা দেখতে। সঙ্গত কারণেই মিডিয়ার চোখ জাইমার দিকে। এরই রেশ ধরে আমিনুল হক বলে দিয়েছেন এতদিন লোকে যা জানতো না—চেলসির বয়সভিত্তিক মেয়ে ফুটবল দলে গোলকিপার হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন জাইমা। আর যাবে কোথায়? সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গালিগালাজ থেকে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা—সবই আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের সমস্যা কোথায়?

সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে জাইমার অতীতের একটি ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট তথ্য সামনে আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, একশ্রেণীর মানুষ এটিকে বিদ্রূপ ও ট্রলের বিষয় বানিয়ে ফেলেছে। তারা আমিনুল হককে পারলে মারে। এমনকি এআই দিয়ে ছবি বানিয়ে জাইমাকে উপহাস করা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না, আমাদের সমস‍্যা কোথায়? কখনো কখনো আমরা উন্মাদের মতো আচরণ করি। জাতি হিসেবেই কি আমরা সংকীর্ণ? বড় কিছু নিতে পারি না। জাইমা চেলসিতে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন, সমস‍্যা বোধহয় এখানে। আমিনুল হক যদি বলতেন, বগুড়ার গাবতলী টিমে নিয়মিত খেলতেন জাইমা, তাহলে এ জাতির মাথায় বাজ পড়তো বলে বলে মনে হয় না। আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বে একটি গভীর অবিশ্বাসের সংস্কৃতি বেড়ে উঠছে। এ দেশে কেউ বড় কিছু করতে গেলে অন‍্যরা হয় হিংসায় মরে, নয়তো অবিশ্বাস করে, কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা থাকুক বা না থাকুক। আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতো লেগেই থাকে কখন পিঠে চাবুক মারবে এ আশায়।

কোন দ্বিধা ছাড়া আমি জাইমা রহমান এবং আমিনুল হকের পাশে আছি। জাইমার ফুটবল খেলা নিয়ে আমিনুল ভাই যা বলেছেন, তা খুবই স্বাভাবিক কথোপকথনের অংশ। এখানে তেল-তোষামদির কোনো ঘটনা ছিলো না। তিনি ছিলেন দেশসেরা গোলরক্ষক, জাইমাও সুযোগ পেয়েছিলেন গোলকিপার হিসেবে খেলার। তাদের দুজনের আলোচনাতে এ বিষয়টি আসবেই। জাইমা রহমান সম্মানের দাবিদার—তার শিক্ষা, রুচি, সচেতনতা এবং ব্যক্তিত্বের জন্য। পরিবারের পাশাপাশি ব‍্যক্তিগত মহিমাতেও তিনি উদ্ভাসিত। অপরদিকে, আমিনুল হক এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং ফ‍্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একজন মৃত‍্যুঞ্জয়ী যোদ্ধা। তার মতো সবাই আমাদের মাথার তাজ।

কিংসটন থেকে চেলসি যেতে সময় লাগে না—সবাই বুঝে, শুধু আমরা বুঝি না বা বুঝেও না বুঝার ভান করি। যারা আমিনুল হক বা জাইমা রহমানকে নিয়ে সমালোচনা করছে, ট্রলে মেতেছে, রাজনীতি খেলছে—আমিনুল বা জাইমার দোষ নয়—সংকীর্ণতাই তাদেরকে এ পথে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের সংকট আমিনুল বা জাইমা নয়। আমাদের মূল সংকট নিজেদের ভেতরের সংকীর্ণতা। কোনো সংকীর্ণ জাতি কি খুব বেশি দূর এগোতে পারে?

লেখক—আইনজীবী, কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিচয়, আমাদের ঠিকানা: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

আমিনুল, জাইমা এবং আমাদের সংকীর্ণতার আয়না

আপডেট সময় ১২:৩৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬

জাইমা রহমানকে নিয়ে আমি এর আগে মাত্র একবারই লিখেছিলাম—২০২১ সালে, ফেইসবুকে। যখন শেখ হাসিনার মন্ত্রী ডা. মুরাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাইমাকে নিয়ে নোংরা আলোচনায় মেতে উঠেছিলো, তখন বিবেকবান কেউই নিশ্চুপ থাকতে পারেননি। আমিও পারিনি। সেই লেখায় আমি জাইমার ক্রীড়াপ্রীতি এবং দেশের প্রতি তার অনবদ্য ভালোবাসার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলাম।

সাধারণত ব্যক্তি-নির্ভর আলোচনা বা আচরণ নিয়ে আমি খুব কমই মতামত দিই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অপ্রয়োজনীয়ও মনে করি। তবে কিছু সময় আসে, যখন চুপ থাকাটাই অন্যায় হয়ে দাঁড়ায়। কাউকে অন্যায়ভাবে আক্রমণের শিকার হতে দেখলে বিবেক নিজে থেকেই সাড়া দেয়। তখন ব্যক্তি আমার ঘনিষ্ঠ কিনা, কিংবা তাকে খুশি করে কোনো লাভ আছে কি না—এসব বিবেচনা করি না। ভাবি শুধু ন্যায়-অন্যায়, দল ও দেশের কথা।

জাইমাকে প্রথম দেখি যখন তার বয়স ছিল আঠারো। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বসিত এক তরুণী। ঈদের সময় তাদের বাসায় আমাদের নিমন্ত্রণ থাকত। আর দশটা বাঙ্গালী মেয়ের মতো জাইমার স্বভাবটাও ছিলো সবাইকে আপন করে নেওয়ার। সে বড়দের আগ বাড়িয়ে সালাম করত, ছোটদের সঙ্গে মিশে যেত সহজেই। শিশুদের প্রতি ছিলো তার স্বাভাবিক মমতা, আমার মেয়ের প্রতিও।

এবার আসি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের প্রসঙ্গে। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি আমার পছন্দের ছিলেন। লম্বা সময় ধরে জাতীয় দলের থাকায় তার প্রতি আলাদা আকর্ষণও ছিল। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। সংসদ নির্বাচনে হেরে গেলেও মন্ত্রী হয়েছেন। ভদ্রতার দিক থেকে তার সুনাম আছে; তাই তাকে ভালো না লাগার কারণ নেই।

তবে আমার ও আমিনুল হকের রাজনীতি আলাদা। আমি কুটনীতি ও মানবাধিকার নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছি ইউরোপ-অ‍্যামেরিকায়। আর আমিনুল ভাই লড়াই করেছেন রাজপথে। অপ্রাসঙ্গিক শোনালেও বলি, হাসিনা রেজিমের পতনে অনেকেরই অবদান আছে। কিন্তু আমার মতো মানুষের ভূমিকা হয়তো আমজনতার কাছে অনুচ্চারিত। আপনাদের নিশ্চয়ই ছয় এমইপির চিঠির কথা মনে আছে। ২০২৩ সালের জুনে এই চিঠি যখন বাজারে আসে, তখন গোটা বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। টকশো, সেমিনার, বক্তৃতা, বিবৃতিতে তখন অন‍্যতম আলোচ‍নার বিষয় ছিলো ছয় এমইপির চিঠি, যাতে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে মধ‍্যরাতের নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবি করা হয়। কিন্তু লোকেরা জানে না এই চিঠি লিখিয়ে আনতে কতটা গলদঘর্ম হয়েছিলাম আমি ও লিংকনসহ আমাদের ফরেইন অ‍্যাফেয়ার্স টীম। আমরা যখন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধরনা দিচ্ছি, আমিনুল ভাইরা তখন জীবন বাজি রেখে মাঠে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছেন।

অর্থাৎ আমার ও আমিনুল হকের রাজনৈতিক জগত ভিন্ন। ফলে তার সাথে কখনো আন্তরিক সৌহার্দ্য বা যোগাযোগ গড়ে উঠেনি আমার। তবে রাজনীতির পথ আলাদা হলেও একজন খেলোয়াড় ও মানুষ হিসেবে আমিনুল হক আমার শ্রদ্ধার জায়গা অর্জন করেছেন।

সম্প্রতি আমিনুল হক এবং জাইমা রহমানকে ঘিরে সোশ‍্যাল মিডিয়া বেশ সরগরম। কারণ আমিনুল ভাই বলেছেন, জাইমা রহমান চেলসির মেয়েদের বয়সভিত্তিক দলে গোলকিপার হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ব‍্যস! এতেই হৈচৈ শুরু করে দিয়েছেন নেটিজেনরা। এতটুকু কথায় এত বিতর্ক—আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারি না। একটি গোষ্ঠী এআই দিয়ে ছবি বানিয়ে ‘ফুটবলার’ জাইমাকে প্রদর্শন করছে ফেইসবুকে। কিন্তু কেনো?

২০১৯ সালের জুন মাসে ওভালে বাংলাদেশ-নিউজিল‍্যান্ড ক্রিকেট ম‍্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন জাইমা রহমান। একই গ‍্যালারিতে আমিও ছিলাম। আমাদের দলের খেলোয়াড়রা চার-ছক্কা মারলে কিংবা প্রতিপক্ষের উইকেট ফেললে জাইমা যেভাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছিলো, তা মাঠের সবার নজর কাড়ে। শুধু ক্রীড়াপ্রমী হিসেবে নয়, সেদিন আমি চিনতে পেরেছিলাম দেশপ্রেমিক জাইমাকেও। সময়ের ব‍্যবধানে জাইমা রহমান এখন একজন ব‍্যারিস্টার, বিলেতের মেইনস্ট্রিম প্র‍্যাকটিশনার। গেলো ডিসেম্বরে বাবার সাথে দেশে ফিরে দ‍্যুতি ছড়াচ্ছেন রাজনীতির জটিল ময়দানে। মিশছেন সাধারণ মানুষের সাথে; বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেখাচ্ছেন সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। সালোয়ার-কামিজ, আবার ঈদের মতো বিশেষ দিনগুলোতে শাড়ি পরে, মার্জিত চলাফেরায় মানুষের মনোযোগ কাড়ছেন জাইমা। ফাঁকতালে স্টেডিয়ামে গেছেন বাংলাদেশের খেলা দেখতে। সঙ্গত কারণেই মিডিয়ার চোখ জাইমার দিকে। এরই রেশ ধরে আমিনুল হক বলে দিয়েছেন এতদিন লোকে যা জানতো না—চেলসির বয়সভিত্তিক মেয়ে ফুটবল দলে গোলকিপার হিসেবে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন জাইমা। আর যাবে কোথায়? সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গালিগালাজ থেকে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা—সবই আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের সমস্যা কোথায়?

সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে জাইমার অতীতের একটি ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট তথ্য সামনে আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, একশ্রেণীর মানুষ এটিকে বিদ্রূপ ও ট্রলের বিষয় বানিয়ে ফেলেছে। তারা আমিনুল হককে পারলে মারে। এমনকি এআই দিয়ে ছবি বানিয়ে জাইমাকে উপহাস করা হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না, আমাদের সমস‍্যা কোথায়? কখনো কখনো আমরা উন্মাদের মতো আচরণ করি। জাতি হিসেবেই কি আমরা সংকীর্ণ? বড় কিছু নিতে পারি না। জাইমা চেলসিতে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন, সমস‍্যা বোধহয় এখানে। আমিনুল হক যদি বলতেন, বগুড়ার গাবতলী টিমে নিয়মিত খেলতেন জাইমা, তাহলে এ জাতির মাথায় বাজ পড়তো বলে বলে মনে হয় না। আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বে একটি গভীর অবিশ্বাসের সংস্কৃতি বেড়ে উঠছে। এ দেশে কেউ বড় কিছু করতে গেলে অন‍্যরা হয় হিংসায় মরে, নয়তো অবিশ্বাস করে, কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা থাকুক বা না থাকুক। আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতো লেগেই থাকে কখন পিঠে চাবুক মারবে এ আশায়।

কোন দ্বিধা ছাড়া আমি জাইমা রহমান এবং আমিনুল হকের পাশে আছি। জাইমার ফুটবল খেলা নিয়ে আমিনুল ভাই যা বলেছেন, তা খুবই স্বাভাবিক কথোপকথনের অংশ। এখানে তেল-তোষামদির কোনো ঘটনা ছিলো না। তিনি ছিলেন দেশসেরা গোলরক্ষক, জাইমাও সুযোগ পেয়েছিলেন গোলকিপার হিসেবে খেলার। তাদের দুজনের আলোচনাতে এ বিষয়টি আসবেই। জাইমা রহমান সম্মানের দাবিদার—তার শিক্ষা, রুচি, সচেতনতা এবং ব্যক্তিত্বের জন্য। পরিবারের পাশাপাশি ব‍্যক্তিগত মহিমাতেও তিনি উদ্ভাসিত। অপরদিকে, আমিনুল হক এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং ফ‍্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একজন মৃত‍্যুঞ্জয়ী যোদ্ধা। তার মতো সবাই আমাদের মাথার তাজ।

কিংসটন থেকে চেলসি যেতে সময় লাগে না—সবাই বুঝে, শুধু আমরা বুঝি না বা বুঝেও না বুঝার ভান করি। যারা আমিনুল হক বা জাইমা রহমানকে নিয়ে সমালোচনা করছে, ট্রলে মেতেছে, রাজনীতি খেলছে—আমিনুল বা জাইমার দোষ নয়—সংকীর্ণতাই তাদেরকে এ পথে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের সংকট আমিনুল বা জাইমা নয়। আমাদের মূল সংকট নিজেদের ভেতরের সংকীর্ণতা। কোনো সংকীর্ণ জাতি কি খুব বেশি দূর এগোতে পারে?

লেখক—আইনজীবী, কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/somokontho/public_html/wp-includes/functions.php on line 5481