যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার সংলাপ শুরুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় অর্ধশত বছর পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসলামাবাদে সরাসরি সংলাপে বসেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। ব্যর্থ হলেও নতুন আলোচনা এগিয়ে নিতে তোড়জোড় চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান। সূত্র জানায়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গোপনে বা ব্যাক চ্যানেলে চলছে আলোচনাও। এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শিগগিরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে।
তবে এসবের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের খবরও আসছে। সমুদ্রপথে ইরানের বাণিজ্য ঠেকাতে ওয়াশিংটনের এ উদ্যোগ। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সেনা ও অস্ত্র মজুত বাড়ছে। এ কারণে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ইসরায়েল বলেছে, তারা ইরান ও তাদের সমর্থিত সংগঠনগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যাবে। তারা অব্যাহতভাবে লেবাননে হামলা চালাচ্ছে।
এ অবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা থামেনি। ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ছিল ৯৫ দশমিক ১৩ ডলার।
যুদ্ধবিরতির কারণে দাম কিছুটা কমলেও তা স্বাভাবিকের চেয়ে এখনও অনেক বেশি। গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, হরমুজ প্রণালির বাইরের অংশে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে মার্কিন বাহিনী ইরানের বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোকে ফেরত পাঠাচ্ছে।
আলজাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবারও টেবিলে ফেরাতে চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। সমঝোতা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গতকাল ইরানে পৌঁছায়। প্রশ্ন হলো– কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে কি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আদৌ বাড়বে? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আগামী দুই দিনের মধ্যে আলোচনা আবার শুরুর তাগিদ দিচ্ছেন।
চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে চীন সফর করছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারগেই লাভরভ। তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গতকাল বেইজিংয়ের গ্রেট হলে সাক্ষাৎ করেন। সিজিটিএন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন। এর আগে মঙ্গলবার বেইজিং সফর করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধের বার্তা দিলেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে। তিনি বিশ্বকে ‘অসাধারণ দুটি দিনের’ জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। পাকিস্তান, ইরান ও বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচক দলগুলো এ সপ্তাহের শেষের দিকে ইসলামাবাদে ফিরতে পারে।
ট্রাম্পের আশাবাদ বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারকে রেকর্ড উচ্চতার দিকে নিয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার ও গতকাল বুধবার সকালে লেনদেনে তেলের দাম কমে গেলেও মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবরোধের কারণে ইরানের সঙ্গে সমুদ্রপথে বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আবারও ৯৫ ডলার ছাড়িয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বলছে, অবরোধের কারণে আরও জাহাজকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যার মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা চীনা মালিকানাধীন ট্যাঙ্কার ‘রিচ স্টারি’ও রয়েছে। গতকাল বুধবার এটিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার অবরোধ শুরুর পর থেকে ইরান-সংশ্লিষ্ট আটটি তেল ট্যাঙ্কার জব্দ করা হয়। গত মঙ্গলবার ওমান উপসাগরে ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে বের হওয়ার চেষ্টাকারী দুটি তেল ট্যাঙ্কারকে একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার থামিয়ে দিয়েছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি গতকাল জানায়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন একটি ইরানি সুপারট্যাঙ্কার অবরোধ সত্ত্বেও প্রণালিটি অতিক্রম করে ইরানের ইমাম খোমেনি বন্দরের দিকে গেছে। এটি সম্ভবত খালি অবস্থায় বন্দরে ফিরেছে।
এ অবস্থায় কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছে ইরানও। দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ড সতর্ক করে দিয়েছে, মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরে বাণিজ্য প্রবাহ ব্যাহত করার জন্য পদক্ষেপ নেবে। আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান অবরোধ এড়াতে তার দক্ষিণ উপকূল থেকে দূরে বিকল্প বন্দর ব্যবহার করবে। তবে ইরানের আরেকটি সংবাদমাধ্যম বলছে, সামুদ্রিক যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এ অবস্থায় কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল ওয়াশিংটনে সরাসরি আলোচনা করেন ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিরা। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এ দিনও বড় হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে শিশুসহ অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না স্টারমার
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দেন– ইরান যুদ্ধে যুক্তরাজ্য অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূনর্বিচেনা করবেন।
গতকাল দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দুই নেতার এ টানাপোড়েনের মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ নিয়ে আমার অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট। আমরা এ যুদ্ধে জড়াতে যাচ্ছি না। এটা আমাদের যুদ্ধ নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাব না। আমি নতি স্বীকার করব না। এ যুদ্ধে যোগ দেওয়া আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয় এবং আমরা তা করব না।’

নিজস্ব সংবাদ : 


























