ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ যদি আগামীকাল শেষ হয়ে যায়, তবে বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বৈশ্বিক বাজার এবং উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর এর প্রভাব সামাল দিতে হবে; যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ ইসরায়েলের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে এঁকে দিয়েছে, এতে গাজা থেকে মনোযোগ সরিয়ে ইরানের দিকে নিয়ে গেছে। যেখানে জাতীয় ঐক্য সবচেয়ে শক্তিশালী এবং তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক যোগ্যতা সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।
তবে ট্রাম্পের জন্য ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ফল হয়েছে উল্টো। এটি তাকে এমন এক সংঘাতে আটকে ফেলেছে যেখান থেকে বেরোনোর কোনো স্পষ্ট পথ নেই। তার উপসাগরীয় আরব মিত্রদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং সেই অর্থনৈতিক আখ্যানকে দুর্বল করে দিয়েছে, যা তাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘এখানে একজন স্পষ্ট বিজয়ী, অন্যজন পরাজিতদের পক্ষে রয়েছেন। নেতানিয়াহু বিজয়ী। তিনি ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ।’
মিলার আরও বলেন, ট্রাম্পের জন্য এমন কোনো পথ নেই; যা তাকে বিজয় ঘোষণা করে সরে যাওয়ার সুযোগ দেবে।
ইরান বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুর বলেন, ট্রাম্প, যিনি ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি করেছিলেন, তিনি ভেনেজুয়েলার ধাঁচের একজন নমনীয় ক্ষমতাধর মধ্যস্থতাকারী ইরানি দেলসি রদ্রিগেজকে খুঁজে পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু, তার পরিবর্তে তিনি উত্তর কোরিয়ার অবাধ্য স্বৈরাচারী মডেলের অনুকরণে ‘একজন ইরানি কিম জং-উনকে’ পেয়েছেন।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো নাতান স্যাকস বলেছেন, ওয়াশিংটনের বিপরীতে তেল আবিব ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে বেছে নেওয়া যুদ্ধ হিসেবে নয়; বরং প্রয়োজনীয় যুদ্ধ হিসেবেই ব্যাপকভাবে দেখা হয়।
স্যাকস আরও বলেন, ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন না ঘটলেও ইরান এবং তার নেতৃত্বাধীন (মিলিশিয়া) অক্ষকে দুর্বল করা নেতানিয়াহুর একটি বিশাল লক্ষ্য ছিল এবারের হামলায়।’
ট্রাম্পের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা মূলত দুই ভাগে পরিচালিত হয়। ইসরায়েল পশ্চিম ও উত্তর ইরানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌ সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে হরমুজ প্রণালিসহ পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে মনোনিবেশ করেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছে। হামলায় মঙ্গলবার নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং বুধবার গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিব নিহত হয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, নেতানিয়াহু সামরিক বাহিনীকে কোনো অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজন ছাড়াই খুঁজে পাওয়া যেকোনো শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার ওপর হামলা চালানোর অনুমোদন দিয়েছেন।
তবে, ইরানে হামলার সাফল্য যুদ্ধকে শেষ করার দিকে নিয়ে আসেনি। ট্রাম্পের সামনে তিনটি খারাপ পথ খোলা রয়েছে। হামলা দীর্ঘায়িত করা, বিজয় ঘোষণা করে তেহরানকে পিছু হটার আশা করা, অথবা পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে আরও গুরুতর করে তোলা। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই তিনটির কোনো পথেই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারবেন না ট্রাম্প।
এ বিষয়ে রয়টার্স হোয়াইট হাউস, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে মন্তব্য চাইলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড বুধবার কংগ্রেসকে বলেছেন যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের সরকার দুর্বল হয়ে পড়লেও, তা এখনও অক্ষত রয়েছে। তেহরান ও তার অনুচরেরা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর স্বার্থে হামলা চালাতে সক্ষম।
ট্রাম্পের এই আপাত ভুল হিসাবের জোরালো প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যখন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলের প্রধান উৎস হরমুজ প্রণালিকে বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন উপসাগরীয় দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো মিলার বলেন, তারা (উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো) এখন যে সাধারণ হুমকিটি উপলব্ধি করছে, তা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া আর কিছুই নয়। উপসাগরীয় অঞ্চল যে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, এই ধারণাটি এখন ঝুঁকির মুখে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ভিন্ন
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানকে অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইসরায়েল বেশি চায়। কারণ, তারা হিসাব করে দেখেছে যে, এতে তাদের আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া অনেক কম হবে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক কৌশলপ্রধান আসাফ ওরিয়ন বলেছেন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো প্রশ্ন তুলছে যে, ইসরায়েল ইরানে বিশৃঙ্খলা চাইছে কি না। এ ধরনের অস্থিতিশীলতায় ইসরায়েল তার প্রতিবেশী বা ওয়াশিংটনের চেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলতঃ এই দুই মিত্রের ঝুঁকি উপলব্ধি ভিন্ন: ইসরায়েল ইরানকে একটি সম্ভাব্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, যা ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে পারে এবং জোটগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্যই ইরানের বিশাল সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলা, যা বিশ্বের বৃহত্তম অফশোর প্রাকৃতিক গ্যাস ভান্ডার এবং কাতারের সঙ্গে ইরানের অংশীদারিত্বে রয়েছে। তবে ট্রাম্প এই হামলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘এই নির্দিষ্ট হামলা সম্পর্কে কিছুই জানত না’, এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ কাতার, যারা নিজেদের গ্যাস স্থাপনায় ইরানি হামলার শিকার হয়েছে, তারাও এর সঙ্গে জড়িত ছিল না।
ট্রাম্পের বুধবারের পোস্টটি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক জোট এবং তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় আরব অংশীদারদের সম্পর্কের মধ্যে তার সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টাকে তুলে ধরে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু প্রতিদিন ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু ইসরায়েলি হামলা সম্পর্কে পূর্বজ্ঞানের কথা অস্বীকার করে ট্রাম্প যা বলেছেন, তা তার এবং নেতানিয়াহুর পূর্ববর্তী দাবির পরিপন্থি। যেখানে তারা বলেছিলেন যে, তাদের সামরিক বাহিনী একযোগে যুদ্ধ করছে।
সাউথ পার্স হামলার দায় ইসরায়েল প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। তবে এই হামলার জেরেই উপসাগরীয় আরব জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরান হামলা করেছিল। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করে যে, ইসরায়েলি হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিতে চালানো হয়েছিল।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, তেহরান উচ্চ মূল্য চাপিয়ে দিতে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি আদায় করতে তার উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়টি পরিমাপ করছে— যার ফলে ওয়াশিংটনের জন্য কেবল চড়া মূল্যেই সরে আসার পথ থাকছে।
ইরানে হামলার কারণে চাঙ্গা ইসরায়েলের বাজার
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জনসমর্থন পাচ্ছেন নেতানিয়াহু। এতে তিনি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন। তবুও এই বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে এটি এখনও জনমত জরিপে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
জরিপগুলো দেখাচ্ছে যে, তার ডানপন্থি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ। নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে তারা প্রায় ৫০টি আসন পেয়েছে, যা আগের ৬৮টি থেকে কম। জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক লাভের মধ্যে এই অমিলটি আপাতত ইসরায়েলের চাঙ্গা বাজারের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। ইসরায়েলের শেয়ারবাজারের এই উল্লম্ফন এবং শেকেলের শক্তিশালী অবস্থান হয়তো আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছে, কিন্তু এগুলো আরও নাজুক একটি বাস্তবতাকে আড়াল করে রেখেছে।
নেতানিয়াহুর প্রাক্তন উপদেষ্টা আভিভ বুশিনস্কি বলেছেন, এই যুদ্ধের বিচার শেষ পর্যন্ত দ্বিমুখী হবে- হয় ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা’র পতন ঘটবে, অথবা ঘটবে না। এর চেয়ে কম কিছু হলে প্রাথমিক সামরিক সাফল্য নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক দায়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যিনি এই অভিযানকে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ অর্জনের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
যদি ইরানে আলি খামেনির প্রভাব দুর্বল অবস্থায়ও টিকে থাকে, তবে আখ্যানটি বিজয় থেকে বাড়াবাড়িতে মোড় নেবে। যা গাজায় হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর অমীমাংসিত হুমকিগুলোকে পুনরায় জাগিয়ে তুলবে।
ইসরায়েলি বাজারগুলো হয়তো স্থিতিশীলতার মূল্য দিচ্ছে। কিন্তু, একটি অসমাপ্ত যুদ্ধের পরিণতির ব্যাপারে তারা অন্ধ বলেই মনে হচ্ছে।

নিজস্ব সংবাদ : 






















