ঢাকা ১২:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

যে সভ্যতা ইরানিদের মূল চালিকাশক্তি

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০১:০৮:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

ইরানকে বুঝতে হলে শুধু একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। তাকে দেখতে হয় হাজার বছরের ইতিহাস, গৌরব এবং চেতনার ধারাবাহিকতা হিসেবে। এই ধারাবাহিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য সভ্যতা। যার শিকড় গেঁথে আছে আজকের ইরান-এর মাটিতে। এই সভ্যতা শুধু একটি সাম্রাজ্যের নাম নয়, বরং এটি এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে শক্তি, জ্ঞান, সহনশীলতা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সাইরাস দ্য গ্রেট-এর নেতৃত্বে আচেমেনীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই সভ্যতার উত্থান ঘটে। সাইরাস শুধু একজন বিজেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী শাসক, যিনি বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে একত্রিত করে একটি বিশাল ও সুসংগঠিত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, যার বিস্তৃত ছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ইসলাম আগমনের পরেও পারস্যের ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যায়নি; বরং নতুন ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে তারা টিকেছিল। ফলে ইরানে ইসলামি বিশ্বাস এবং পারস্য ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটে।

পারস্য সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের উদারতা ও সহনশীলতা। তারা বিজিত জাতিগুলোর ওপর নিজেদের সংস্কৃতি চাপিয়ে না দিয়ে বরং তাদের ধর্ম, ভাষা ও প্রথাকে সম্মান করত। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল ভিত্তি ছিল জরথুস্ত্রবাদ। এই সভ্যতার মানুষ বিশ্বাস করত যে সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য এবং সৎ কাজই মানুষের জীবনের মূল আদর্শ হওয়া উচিত।

প্রশাসনিক দিক থেকেও পারস্য সভ্যতা ছিল উন্নত। তারা বিশাল সাম্রাজ্যকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য ‘সাত্রাপি’ নামে প্রদেশভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চালু করে, যেখানে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা শাসক নিযুক্ত থাকত।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তারা বিখ্যাত ‘রয়্যাল রোড’ নির্মাণ করে, যা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তকে দ্রুত ও সহজভাবে সংযুক্ত করত। পাশাপাশি তাদের ডাক-ব্যবস্থা ছিল এতটাই কার্যকর যে অল্প সময়েই দূর-দূরান্তে খবর পৌঁছে যেত, যা সেই সময়ের জন্য ছিল এক অসাধারণ উদ্ভাবন।

পারস্যদের সামরিক শক্তিও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাদের সেনাবাহিনী ছিল আজকের ইরানের মতই সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ, এবং এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ইমর্টালস নামের একটি অভিজাত বাহিনী, যারা সর্বদা সমসংখ্যক থেকে রাজাকে রক্ষা করত এবং যুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করত।

তবে পারস্য সভ্যতার প্রকৃত শক্তি শুধু তাদের অস্ত্রশক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাদের কূটনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয়ই তাদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের মূল কারণ।

অন্যান্য সভ্যতার সঙ্গে পারস্যদের সম্পর্কও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে গ্রিক সভ্যতার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ, যা গ্রিক-পারস্য যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধগুলো শুধু ক্ষমতার লড়াই ছিল না, বরং দুই ভিন্ন সভ্যতার আদর্শ ও জীবনধারারও সংঘর্ষ ছিল।

ইরানের শক্তির মূল রহস্য হলো- তাদের আত্মপরিচয়, ঐতিহ্যের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা এবং সংকটে একত্রিত হওয়ার মানসিকতা। যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে-পারস্য সভ্যতা। এভাবে ইরানিরা ইতিহাসকে শুধু অতীত হিসেবে দেখে না; বরং তা বর্তমানের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে নানা নিষেধাজ্ঞা, চাপ এবং সংঘাতের মধ্যেও ইরান তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে মূলত এই সাংস্কৃতিক শক্তির কারণেই। তাদের কাছে রাষ্ট্র শুধু একটি রাজনৈতিক সত্তা নয়, এটি একটি সভ্যতার ধারাবাহিকতা—যা তাদের অস্তিত্বের শেকড়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।

আমরা সবাই জুলাই প্রোডাক্ট— ডা. শফিকুর রহমান

যে সভ্যতা ইরানিদের মূল চালিকাশক্তি

আপডেট সময় ০১:০৮:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ইরানকে বুঝতে হলে শুধু একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। তাকে দেখতে হয় হাজার বছরের ইতিহাস, গৌরব এবং চেতনার ধারাবাহিকতা হিসেবে। এই ধারাবাহিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য সভ্যতা। যার শিকড় গেঁথে আছে আজকের ইরান-এর মাটিতে। এই সভ্যতা শুধু একটি সাম্রাজ্যের নাম নয়, বরং এটি এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে শক্তি, জ্ঞান, সহনশীলতা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সাইরাস দ্য গ্রেট-এর নেতৃত্বে আচেমেনীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই সভ্যতার উত্থান ঘটে। সাইরাস শুধু একজন বিজেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী শাসক, যিনি বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে একত্রিত করে একটি বিশাল ও সুসংগঠিত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, যার বিস্তৃত ছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ইসলাম আগমনের পরেও পারস্যের ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যায়নি; বরং নতুন ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে তারা টিকেছিল। ফলে ইরানে ইসলামি বিশ্বাস এবং পারস্য ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটে।

পারস্য সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের উদারতা ও সহনশীলতা। তারা বিজিত জাতিগুলোর ওপর নিজেদের সংস্কৃতি চাপিয়ে না দিয়ে বরং তাদের ধর্ম, ভাষা ও প্রথাকে সম্মান করত। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল ভিত্তি ছিল জরথুস্ত্রবাদ। এই সভ্যতার মানুষ বিশ্বাস করত যে সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য এবং সৎ কাজই মানুষের জীবনের মূল আদর্শ হওয়া উচিত।

প্রশাসনিক দিক থেকেও পারস্য সভ্যতা ছিল উন্নত। তারা বিশাল সাম্রাজ্যকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য ‘সাত্রাপি’ নামে প্রদেশভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চালু করে, যেখানে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা শাসক নিযুক্ত থাকত।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তারা বিখ্যাত ‘রয়্যাল রোড’ নির্মাণ করে, যা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তকে দ্রুত ও সহজভাবে সংযুক্ত করত। পাশাপাশি তাদের ডাক-ব্যবস্থা ছিল এতটাই কার্যকর যে অল্প সময়েই দূর-দূরান্তে খবর পৌঁছে যেত, যা সেই সময়ের জন্য ছিল এক অসাধারণ উদ্ভাবন।

পারস্যদের সামরিক শক্তিও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাদের সেনাবাহিনী ছিল আজকের ইরানের মতই সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ, এবং এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ইমর্টালস নামের একটি অভিজাত বাহিনী, যারা সর্বদা সমসংখ্যক থেকে রাজাকে রক্ষা করত এবং যুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করত।

তবে পারস্য সভ্যতার প্রকৃত শক্তি শুধু তাদের অস্ত্রশক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাদের কূটনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয়ই তাদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের মূল কারণ।

অন্যান্য সভ্যতার সঙ্গে পারস্যদের সম্পর্কও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে গ্রিক সভ্যতার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ, যা গ্রিক-পারস্য যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধগুলো শুধু ক্ষমতার লড়াই ছিল না, বরং দুই ভিন্ন সভ্যতার আদর্শ ও জীবনধারারও সংঘর্ষ ছিল।

ইরানের শক্তির মূল রহস্য হলো- তাদের আত্মপরিচয়, ঐতিহ্যের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা এবং সংকটে একত্রিত হওয়ার মানসিকতা। যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে-পারস্য সভ্যতা। এভাবে ইরানিরা ইতিহাসকে শুধু অতীত হিসেবে দেখে না; বরং তা বর্তমানের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে নানা নিষেধাজ্ঞা, চাপ এবং সংঘাতের মধ্যেও ইরান তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে মূলত এই সাংস্কৃতিক শক্তির কারণেই। তাদের কাছে রাষ্ট্র শুধু একটি রাজনৈতিক সত্তা নয়, এটি একটি সভ্যতার ধারাবাহিকতা—যা তাদের অস্তিত্বের শেকড়।


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/somokontho/public_html/wp-includes/functions.php on line 5481