দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাত ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে তুরস্কের ইস্তান্বুলে চার দিনের আলোচনা ফলহীন হয়ে শেষ হয়েছে। পাকিস্তানি সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে। বুধবার (৩০ অক্টোবর) সকালে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় আফগান প্রতিনিধিদলকে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয়।
এই আলোচনা কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় আয়োজিত; এর আগে দোহাতে দুই দেশের প্রথম রাউন্ড বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯ অক্টোবর দোহায় এক সপ্তাহ ধরার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থামিয়ে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ইস্তান্বুলে অনুষ্ঠিত এ রাউন্ডে গোলমেলে পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সঠিক চূড়ান্ত সমাধান বেরেনি।
পাকিস্তান বলছে—আফগান প্রতিনিধিরা তাদের মূল দাবিতে অবস্থান বদলিয়েছে। ইসলামাবাদ চায় কাবুল পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি) গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিক; কিন্তু পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্র বলছে, আফগান আলোচকরা কাবুলের নির্দেশনাসমূহের কারণে আলোচনাকে জটিল করে তুলেছেন। এক কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, আফগান প্রতিনিধিদের কাবুল থেকে পাওয়া নির্দেশই আলোচনার পথে বাঁধা হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকরাও আশঙ্কা করছেন যে দুই দেশকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালতেই থাকবে, তবে নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা এখন বেশি বলেই মনে করছেন তারা। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় কাবুল কর্তৃপক্ষ পাল্টা পাকিস্তানকে দোষারোপ করেছে। আফগান গণমাধ্যমে কাবুলের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে—পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের মধ্যে ‘সমন্বয়ের অভাব’ ছিল, তারা ‘পরিষ্কার যুক্তি’ উপস্থাপন করতে পারেনি এবং বারবার ‘আলোচনার টেবিল ছেড়ে চলে গেছে’।
আফগান পক্ষের দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক উপমন্ত্রী হাজি নাজিব। পাকিস্তানের প্রতিনিধি কারা ছিলেন, তা সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
গত কয়েক সপ্তাহে দুই দেশের সীমান্তসংলগ্ন সংঘাতে সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষ নিহত হওয়া, আহত হওয়ার ঘটনা বারবার ঘটেছে। ঐতিহাসিকভাবে আফগান তালেবানকে পাকিস্তান সমর্থন করে—বিশেষ করে ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকালে পাকিস্তানে অনেকে তা স্বাগত জানায়—তবে সেই পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তীব্রভাবে খারাপের দিকে গেছে। মূলত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি)।
টিটিপি ২০০৭ সালে আলাদা করে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সরকারি লক্ষ্যবস্তু হয়ে আছে; তারা জেলখানায় থাকা তাদের সদস্যদের মুক্তি ও আদিবাসী অঞ্চলগুলোর প্রশাসনিক দাবির জন্য লড়াই করছে। যদিও আফগান তালেবান ও পাকিস্তান তালেবান আলাদা গোষ্ঠী, তাদের মধ্যে ধারণাগত মিল আছে—এই মিলই সমস্যা জটিল করে তোলে। পাকিস্তান অভিযোগ করে যে কাবুল শুধু টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে না, বরং বিএলএ ও ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভৃতি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও শঙ্কা রয়েছে; কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আফগান নেতারা টিটিপিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখিয়ে আসছেন এবং বারবার জানিয়েছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ১৯ অক্টোবর দোহায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ স্বাক্ষর করেছিলেন। ইয়াকুও মন্তব্য করেছিলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রয়োজনে কখনো ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি বৈষয়িকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং সন্ত্রাসবাদের কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই।
আফগানিস্তান থেকে টিটিপি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নির্মূল করতে আন্তর্জাতিকভাবে—ইরান, রাশিয়া, চীন ও মধ্য এশিয়ার কিছু দেশ—আফগান তালেবানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে; অক্টোবরের মস্কো বৈঠকেও এ আবেদন পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ওই বৈঠকে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিও অংশগ্রহণ করেছিলেন।
সাম্প্রতিক কয়েক হামলায় সশস্ত্র সংঘাতে দুই ডজনের বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সাল পাকিস্তানের জন্য গত দশকের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছরের মধ্যে একটি; ওই বছরে ২৫০০’র বেশি হতাহত হয়েছিল, আর ২০২৫ সালের মধ্যেই সেই সংখ্যা অতিক্রম করার পথে বলে ধরা হচ্ছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু—নাগরিক হোক বা নিরাপত্তা সদস্য—দুটোই হয়েছে; ক্ষেত্রগুলি প্রাধান্য পেয়েছে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে, যেখানে টিটিপির কার্যক্রম বাড়েছে। এসিএলইডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে টিটিপি কমপক্ষে ৬০০টির মতো হামলা বা সংঘর্ষে জড়িয়েছেন এবং ২০২৫ সালে তাদের কার্যকলাপ ২০২৪ সালের ওপর দিয়ে গেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইহসানউল্লাহ টিপু মেহসুদ মনে করেন—টিটিপি ও আফগান তালেবানের সম্পর্ক মূলত মতাদর্শগত, তাই আফগান সরকারের পক্ষে ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া কঠিন। সাবেক ফেলো বাকির সাজ্জাদও বলছেন, আফগান তালেবানদের পাশে টিটিপি থাকা তাদের জন্য নৈতিক ও কৌশলগতভাবে সহজ নয়—এই নির্ভরতার কারণেই পাকিস্তানের উদ্বেগ প্রশমন কঠিন। এছাড়া সাংবাদিক সামি ইউসুফজাইও শান্তির সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে বলে আশঙ্কা করেছেন। তারা দুজনেই মনে করেন, আন্তর্জাতিক চাপ কিংবা সামরিক অভিযানের সত্ত্বেও তালেবান তাদের মিত্রদের প্রতি স্থির থাকেন—এমন উদাহরণ ইতিহাসে দেখা গেছে।
কূটনৈতিকভাবে কাতার, তুরস্ক ও চীন মধ্যস্থতায় চেষ্টা করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন পাকিস্তান হয়তো বুঝে ফেলছে যে তাদের উদ্বেগ মেটাতে কেবল কূটনৈতিক উপায় যথেষ্ট হবে না। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক কালে হুমকি ভঙ্গিতে বলেছেন, আফগানিস্তানের টিটিপি-আশ্রয়স্থলগুলোকে নিশানায় রেখে বিমান হামলা বা সীমান্ত অতিক্রম করে স্থল অভিযান চালানো হতে পারে—এ ধরনের কণ্ঠস্বরও পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে।
তবে কিছু বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, আবারও মধ্যস্থতাকারীরা বিশেষ করে কাতার ও তুরস্ক শেষ মুহূর্তে আলোচনায় সক্রিয় হবে এবং যুদ্ধবিরতি মেনে চলার শর্তে অর্থনৈতিক প্রণোদনা বা সহায়তা প্রদানের মতো উপায় প্রয়োগ করা যেতে পারে—যেগুলো দুই দেশকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাত থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করবে।
অধিকন্তু, সামি ইউসুফজাই বলেন—পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান হলে আফগান তালেবানের প্রতি অভ্যন্তরে সহানুভূতি বেড়ে যেতে পারে। বোমা হামলা বা নির্দোষ লোক নিহত হলে জনগণের মধ্যে পাকিস্তানবিরোধী ভাবনা বাড়বে এবং আফগান তালেবানের প্রতি সমর্থন আরো শক্ত হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যদি তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কোনো নির্দেশ দেন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন, তাহলে তরুণদের মধ্যে যোগদানের প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে—যা উভয় দেশের জন্যই বড় ঝুঁকি।
সংক্ষেপে বলা যায়—গভীর অবিশ্বাস, পারস্পরিক অগ্রাধিকারের টানাপোড়েন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর মতাদর্শগত সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না, এবং পরিস্থিতি অনিশ্চিত ও শঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে।

নিজস্ব সংবাদ : 




























