ঢাকা ০৮:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখান করল ভারত Logo ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিতে ‘হামলার’ প্রতিবাদে কেএমপি দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ Logo জামায়াত কি ইসলামের ঠিকাদারি নিয়েছে : প্রশ্ন সালাহউদ্দিনের Logo হাসিনার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করেছেন আল্লামা মামুনুল হক : হাসনাত আব্দুল্লাহ Logo নতুন ঘোষণা দিয়ে শাহবাগ ছাড়ল ইনকিলাব মঞ্চ Logo ৫ বিষয়ে ভিত্তি করে বিএনপির ইশতেহার: মাহদী আমিন Logo চট্টগ্রাম বন্দরের বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত জনগণকে জানিয়ে নিতে হবে: ফরহাদ মজহার Logo আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ জামায়াতের Logo উন্মুক্ত মঞ্চে তারেক রহমানকে সরাসরি আলোচনার আমন্ত্রণ জামায়াত আমিরের Logo মিথ্যাচারের দাঁতভাঙা জবাব দেবে জনগণ: মির্জা আব্বাস

এনইআইআরে মোবাইল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১০ লাখ মানুষের রুজি-রুটির উদ্বেগ

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ১২:১৩:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪৬ বার পড়া হয়েছে

এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার) বাস্তবায়ন হলে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১০ লাখ মানুষের রুজি-রুটির উদ্বেগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এনইআইআর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত আমরা স্বাগত জানাই; কিন্তু নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে আন-অফিসিয়াল ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ না করে সিদ্ধান্ত নিলে এটি লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার ক্ষতির কারণ হতে পারে। ২৬ বছরের শ্রমে গড়ে তোলা ইকোসিস্টেমে প্রায় ২৫ হাজার ব্যবসা ও আনুমানিক ১০ লাখ মানুষের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল এই খাত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, সবার জন্য সমান আমদানির সুযোগ ও সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত অনৈতিক প্রথা বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি।

বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানের মোবাইল ব্যবসায়ীরা মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিটিআরসি কর্মকর্তাদের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানান।

মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি, বাংলাদেশের সভাপতি মো. আসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসসহ নেতারা বিটিআরসির একজন মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় বিটিআরসির সামনে বিভিন্ন মার্কেটের মোবাইল ব্যবসায়ীরা অবস্থান নেন। টেলিযোগাযোগ খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার রোধ করতে আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর সিস্টেম চালুর ঘোষণা দেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

বুধবার (২৯ অক্টোবর) বিটিআরসি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এর ফলে দেশের নেটওয়ার্কে নিবন্ধনহীন বা আনঅফিসিয়াল মোবাইল সেটের ব্যবহার বন্ধ হবে।
এনইআইআর চালুর ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানতে পেরেছি সরকার এনইআইআর বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। দেশীয় বাজারে কর ফাঁকি, অপরাধ সংক্রান্ত ডিভাইস ও চুরি-ছিনতাই হওয়া মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার উদ্দেশ্যে এ ব্যবস্থা আনার কথা বলা হচ্ছে। আমরা সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

তবে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি- এই নীতিনির্ধারণ ও প্রস্তুতকারী প্রক্রিয়ায় আমাদের মতো ব্যাপক অংশীদারদের পরামর্শ বা অংশগ্রহণ কার্যত অনুপস্থিত রয়েছে। দেশের আনুমানিক ৬০ শতাংশ আন-অফিসিয়াল (বাজারের একটি বড় অংশ) হ্যান্ডসেট ব্যবসা আমাদের মাধ্যমে চলে; সুতরাং আমাদের মতো শতকরা ৯৫ ভাগ সাধারণ ব্যবসায়ীকে এ সিদ্ধান্ত প্রণয়নের স্টেজে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত ছিল।

এনইআইআর বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীরা গুরুতর সমস্যা ও অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেগুলো হলো-

বাজার মনোপলি ও অনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা: কিছু মুনাফালোভী সিন্ডিকেট এনইআইআর প্রক্রিয়ায় অনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করে সাধারণ ভোক্তা শ্রেণিকে উচ্চ মূল্যে হ্যান্ডসেট কিনতে বাধ্য করাতে সক্ষম হলে, সেটা বাজারে মনোপলি সৃষ্টি করবে এবং সাধারণ ব্যবহারকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন করবে।

বৈধ পদ্ধতিতে আমদানির সুযোগ সীমাবদ্ধতা: আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী সরকারের নিয়ম মেনে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে এলসি করে আমদানি করতে চাইলে তা বর্তমানে কিছু সিন্ডিকেটের কারণে কার্যত সীমাবদ্ধ।

ফলে বিদেশ থেকে আসা পর্যটক/প্রবাসী-ভিত্তিক হ্যান্ডসেট ক্রয় ব্যবসা বিরাজমান আছে। অর্থনৈতিক ও রাজস্ব সম্ভাবনা হারানো: প্রতি হ্যান্ডসেটে গড়ে আমাদের আনুমানিক খরচ ৭ হাজার টাকা। দিনে গড়ে প্রায় ১ হাজার হ্যান্ডসেট আসায় দৈনিক খরচ ৭০ লাখ টাকা, বছরে প্রায় ২৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যদি সরকার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নিয়মে আমদানির সুযোগ সবার জন্য খুলে দেয় আমরাও বৈধভাবে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে রাজস্বে অংশ নিতে পারি। এতে সরকারের আয় হতে পারে লক্ষ-কোটি টাকা পর্যন্ত।

উদাহরণস্বরূপ, গড়ভাবে প্রতি হ্যান্ডসেট মূল্য ১ লাখ ধরলে হ্যান্ডসেট প্রতি ৫ হাজার টাকা (৫ শতাংশ) কর আদায় করা হলে বছরে বৃহৎ পরিসরে রাজস্ব অর্জন করা যাবে।

দায়বদ্ধতা ও কর্মসংস্থান: গত ২৬ বছরে আমরা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছি। বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সরাসরি এই খাতে যুক্ত; প্রত্যেকের সঙ্গে গড়ে ১০ জন করে কর্মী ধরা হলে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার পরিবার নির্ভরশীল। যদি পরিবারে গড়ে ৪ জন ধরা হয়, তাহলে প্রায় ১০ লাখ মানুষের রুটি-রুটি সরাসরি এই ইন্ডাস্ট্রির ওপর নির্ভরশীল। আনুষঙ্গিক এক্সেসরিজ খাতসহ মোট ১৮–২০ লাখ মানুষের জীবিকা এই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে পুরো জাতি মুখিয়ে আছে। এর আগে তড়িঘড়ি করে দেশের এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া, পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগেরই কোনো ষড়যন্ত্র বলে আমরা মনে করি। আমাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের সঙ্গে এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী আর সরকারকে মুখোমুখি করা হচ্ছে। আর এতে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ বর্তমান সরকারের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করছেন। এই ব্যবসায়ী তারাই, যারা আওয়ামী লীগের সময়ে নামে-বেনামে এবং অনৈতিক ও অবৈধ পন্থায় বিভিন্ন লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছে। দেশেই মোবাইল উৎপাদনের কথা বলে, লাইসেন্স বাগিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করে, এখানে কেবল অ্যাসেম্বল করছে। তাদের মদদেই সরকারের মধ্যে থাকা আওয়ামীপন্থী আমলাদের অতি উৎসাহে, ঠিক নির্বাচনের আগে এমন হঠকারি একটি সিদ্ধান্তের দিকে সরকারকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

স্বচ্ছতা ও সিন্ডিকেট চিহ্নিতকরণ: কিছু সুবিধাভোগী বা অনৈতিক সিন্ডিকেট সরকারের কাছে পণ্য মূল্য কম দেখিয়ে (উদাহরণ হিসেবে ৫০০ ডলারের পণ্যকে ৮০ ডলারে দেখানো) ব্যাপক রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রগুলো ব্যবস্থা করে ভোগান্তি বৃদ্ধি করছে—এগুলো খুঁজে বের করে সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দিতে হবে।

ব্যবসায়ী নেতারা আরো বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে জানাই-আমরাও সরকারকে কর দিতে চাই; আমরা চাই আইনি পথে আমদানি, বাজারজাত ও বিক্রি করতে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আমাদের মতো সব স্তরের ব্যবসায়ীকে অংশগ্রহণের সুযোগ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক।

আমরা বিশেষভাবে অনুরোধ করব- এনইআইআর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সব স্টেকহোল্ডার বিশেষ করে আন-অফিসিয়াল ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হোক। সরকারের কাছে আহ্বান যে, আমদানির লাইসেন্স ও এলসি-প্রক্রিয়া সহজ ও সবার জন্য সমান সুযোগে চালু রেখে ভ্যাট-ট্যাক্স সংগ্রহ করার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো হোক। সিন্ডিকেট-ভিত্তিক আমদানি-প্রক্রিয়া ও মূল্য-মানি ফাঁকফোকরই হ্রাস করতে কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যকর তদন্ত ও তদারকি জরুরি। ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থান প্রদান ছাড়া হঠাৎ কোনো বাজার বন্ধ করা হলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে স্থির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

ব্যবসায়ীরা বলেন, আমাদের বিশ্বাস- দেশের ডিজিটাল উন্নয়ন ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিকে আমরা সমর্থন করি। কিন্তু তা যেন শুধুই কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে না দাঁড়ায়। নির্বাচনমুখী এই সময়কালে দ্রুত, তড়িঘড়ি ও একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে- এ জন্য আমরা সতর্ক ও উদ্বিগ্ন।

আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই- সুযোগ হলে আমাদের বৈঠকে ডেকে নীতিমালা চূড়ান্তকরণের আগে আমাদের মতামত গ্রহণ করবেন এবং জনগণ ও দেশের অর্থনীতির উন্নয়নকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

শতকরা ৯৫ শতাংশ সাধারণ ব্যবসায়ী -৫ শতাংশ মুনাফালোভী সিন্ডিকেট এই বিভাজন সম্পর্কে গণমাধ্যম সত্যতা যাচাই করে জনগণের সামনে তুলে ধরবে বলে আশা করি।

ব্যবসায়ীরা বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলেও, লাভবান হবে কারা; সেটা আপনারা তুলে ধরুন। দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে যারা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় একটি মানসম্পন্ন স্মার্টফোন কেনার সুযোগ পাচ্ছেন? নাকি এই ভোক্তা শ্রেণিকেই একই মূল্যে নিম্নমানের মোড়ক বদলানো, লো কনফিগারেশনের হ্যান্ডসেট কিনতে বাধ্য করা ব্যবসায়ীরা? যদি দেশ, জাতি এবং সাধারণ জনগণের এতে কোনো উপকার থাকে, তাহলে আমরাও এতে সহযোগিতা করবো। কিন্তু আমরা এখানে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের লাভ ছাড়া অন্য কিছু দেখছি না। যদি সেটা না হয়, তাহলে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে কর পরিশোধ সাপেক্ষে অতিরিক্ত কোনো শর্ত ছাড়া, মোবাইল আমদানির সুযোগ আমাদেরও দেওয়া হোক। সবার জন্য উন্মুক্ত করা হোক।

বাংলাদেশের বিভিন্ন শপিংমলের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আরও ছিলেন- মো. ফয়সাল আজাদ, দিদারুল ইসলাম খান, ফারুক আহমেদ পিন্টু, সাইফুল ইসলাম এহসান, মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান, রবিউল আলম, মিজানুর রহমান মিলন, কাজী জিল্লুর রহমান জনি, মুহাম্মদ দ্বীন ইসলাম, কামরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম রুবেল, মোস্তাফিজুর রহমান, আব্দুল্লাহ আল ফারুকী, পারভেজ, মো. সেলিম গাজী, মো. পারভেজ, শাফায়েত হোসেন, নাসির উদ্দিন খান, মেহেদী হাসান, মো. সোহেল রানা, আনিসুর রহমান সোহেল, মো. রাসেল, মো. মজিবর রহমান, মো. সাজ্জাদুর রহমান বনি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

কামাল হোসাইন

হ্যালো আমি কামাল হোসাইন, আমি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ২০১৭ সাল থেকে এই পত্রিকার সাথে কাজ করছি। এভাবে এখানে আপনার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে কিছু লিখতে পারবেন।
জনপ্রিয় সংবাদ

পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখান করল ভারত

এনইআইআরে মোবাইল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১০ লাখ মানুষের রুজি-রুটির উদ্বেগ

আপডেট সময় ১২:১৩:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫

এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার) বাস্তবায়ন হলে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১০ লাখ মানুষের রুজি-রুটির উদ্বেগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এনইআইআর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত আমরা স্বাগত জানাই; কিন্তু নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে আন-অফিসিয়াল ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ না করে সিদ্ধান্ত নিলে এটি লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার ক্ষতির কারণ হতে পারে। ২৬ বছরের শ্রমে গড়ে তোলা ইকোসিস্টেমে প্রায় ২৫ হাজার ব্যবসা ও আনুমানিক ১০ লাখ মানুষের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল এই খাত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, সবার জন্য সমান আমদানির সুযোগ ও সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত অনৈতিক প্রথা বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি।

বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানের মোবাইল ব্যবসায়ীরা মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিটিআরসি কর্মকর্তাদের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানান।

মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি, বাংলাদেশের সভাপতি মো. আসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসসহ নেতারা বিটিআরসির একজন মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় বিটিআরসির সামনে বিভিন্ন মার্কেটের মোবাইল ব্যবসায়ীরা অবস্থান নেন। টেলিযোগাযোগ খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার রোধ করতে আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর সিস্টেম চালুর ঘোষণা দেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

বুধবার (২৯ অক্টোবর) বিটিআরসি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এর ফলে দেশের নেটওয়ার্কে নিবন্ধনহীন বা আনঅফিসিয়াল মোবাইল সেটের ব্যবহার বন্ধ হবে।
এনইআইআর চালুর ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানতে পেরেছি সরকার এনইআইআর বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। দেশীয় বাজারে কর ফাঁকি, অপরাধ সংক্রান্ত ডিভাইস ও চুরি-ছিনতাই হওয়া মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার উদ্দেশ্যে এ ব্যবস্থা আনার কথা বলা হচ্ছে। আমরা সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

তবে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি- এই নীতিনির্ধারণ ও প্রস্তুতকারী প্রক্রিয়ায় আমাদের মতো ব্যাপক অংশীদারদের পরামর্শ বা অংশগ্রহণ কার্যত অনুপস্থিত রয়েছে। দেশের আনুমানিক ৬০ শতাংশ আন-অফিসিয়াল (বাজারের একটি বড় অংশ) হ্যান্ডসেট ব্যবসা আমাদের মাধ্যমে চলে; সুতরাং আমাদের মতো শতকরা ৯৫ ভাগ সাধারণ ব্যবসায়ীকে এ সিদ্ধান্ত প্রণয়নের স্টেজে যুক্ত করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত ছিল।

এনইআইআর বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীরা গুরুতর সমস্যা ও অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেগুলো হলো-

বাজার মনোপলি ও অনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা: কিছু মুনাফালোভী সিন্ডিকেট এনইআইআর প্রক্রিয়ায় অনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করে সাধারণ ভোক্তা শ্রেণিকে উচ্চ মূল্যে হ্যান্ডসেট কিনতে বাধ্য করাতে সক্ষম হলে, সেটা বাজারে মনোপলি সৃষ্টি করবে এবং সাধারণ ব্যবহারকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন করবে।

বৈধ পদ্ধতিতে আমদানির সুযোগ সীমাবদ্ধতা: আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী সরকারের নিয়ম মেনে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে এলসি করে আমদানি করতে চাইলে তা বর্তমানে কিছু সিন্ডিকেটের কারণে কার্যত সীমাবদ্ধ।

ফলে বিদেশ থেকে আসা পর্যটক/প্রবাসী-ভিত্তিক হ্যান্ডসেট ক্রয় ব্যবসা বিরাজমান আছে। অর্থনৈতিক ও রাজস্ব সম্ভাবনা হারানো: প্রতি হ্যান্ডসেটে গড়ে আমাদের আনুমানিক খরচ ৭ হাজার টাকা। দিনে গড়ে প্রায় ১ হাজার হ্যান্ডসেট আসায় দৈনিক খরচ ৭০ লাখ টাকা, বছরে প্রায় ২৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যদি সরকার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নিয়মে আমদানির সুযোগ সবার জন্য খুলে দেয় আমরাও বৈধভাবে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে রাজস্বে অংশ নিতে পারি। এতে সরকারের আয় হতে পারে লক্ষ-কোটি টাকা পর্যন্ত।

উদাহরণস্বরূপ, গড়ভাবে প্রতি হ্যান্ডসেট মূল্য ১ লাখ ধরলে হ্যান্ডসেট প্রতি ৫ হাজার টাকা (৫ শতাংশ) কর আদায় করা হলে বছরে বৃহৎ পরিসরে রাজস্ব অর্জন করা যাবে।

দায়বদ্ধতা ও কর্মসংস্থান: গত ২৬ বছরে আমরা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছি। বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সরাসরি এই খাতে যুক্ত; প্রত্যেকের সঙ্গে গড়ে ১০ জন করে কর্মী ধরা হলে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার পরিবার নির্ভরশীল। যদি পরিবারে গড়ে ৪ জন ধরা হয়, তাহলে প্রায় ১০ লাখ মানুষের রুটি-রুটি সরাসরি এই ইন্ডাস্ট্রির ওপর নির্ভরশীল। আনুষঙ্গিক এক্সেসরিজ খাতসহ মোট ১৮–২০ লাখ মানুষের জীবিকা এই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে পুরো জাতি মুখিয়ে আছে। এর আগে তড়িঘড়ি করে দেশের এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া, পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগেরই কোনো ষড়যন্ত্র বলে আমরা মনে করি। আমাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের সঙ্গে এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী আর সরকারকে মুখোমুখি করা হচ্ছে। আর এতে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ বর্তমান সরকারের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করছেন। এই ব্যবসায়ী তারাই, যারা আওয়ামী লীগের সময়ে নামে-বেনামে এবং অনৈতিক ও অবৈধ পন্থায় বিভিন্ন লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছে। দেশেই মোবাইল উৎপাদনের কথা বলে, লাইসেন্স বাগিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করে, এখানে কেবল অ্যাসেম্বল করছে। তাদের মদদেই সরকারের মধ্যে থাকা আওয়ামীপন্থী আমলাদের অতি উৎসাহে, ঠিক নির্বাচনের আগে এমন হঠকারি একটি সিদ্ধান্তের দিকে সরকারকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

স্বচ্ছতা ও সিন্ডিকেট চিহ্নিতকরণ: কিছু সুবিধাভোগী বা অনৈতিক সিন্ডিকেট সরকারের কাছে পণ্য মূল্য কম দেখিয়ে (উদাহরণ হিসেবে ৫০০ ডলারের পণ্যকে ৮০ ডলারে দেখানো) ব্যাপক রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রগুলো ব্যবস্থা করে ভোগান্তি বৃদ্ধি করছে—এগুলো খুঁজে বের করে সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দিতে হবে।

ব্যবসায়ী নেতারা আরো বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে জানাই-আমরাও সরকারকে কর দিতে চাই; আমরা চাই আইনি পথে আমদানি, বাজারজাত ও বিক্রি করতে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আমাদের মতো সব স্তরের ব্যবসায়ীকে অংশগ্রহণের সুযোগ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক।

আমরা বিশেষভাবে অনুরোধ করব- এনইআইআর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সব স্টেকহোল্ডার বিশেষ করে আন-অফিসিয়াল ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হোক। সরকারের কাছে আহ্বান যে, আমদানির লাইসেন্স ও এলসি-প্রক্রিয়া সহজ ও সবার জন্য সমান সুযোগে চালু রেখে ভ্যাট-ট্যাক্স সংগ্রহ করার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো হোক। সিন্ডিকেট-ভিত্তিক আমদানি-প্রক্রিয়া ও মূল্য-মানি ফাঁকফোকরই হ্রাস করতে কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যকর তদন্ত ও তদারকি জরুরি। ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থান প্রদান ছাড়া হঠাৎ কোনো বাজার বন্ধ করা হলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে স্থির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

ব্যবসায়ীরা বলেন, আমাদের বিশ্বাস- দেশের ডিজিটাল উন্নয়ন ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিকে আমরা সমর্থন করি। কিন্তু তা যেন শুধুই কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে না দাঁড়ায়। নির্বাচনমুখী এই সময়কালে দ্রুত, তড়িঘড়ি ও একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে- এ জন্য আমরা সতর্ক ও উদ্বিগ্ন।

আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই- সুযোগ হলে আমাদের বৈঠকে ডেকে নীতিমালা চূড়ান্তকরণের আগে আমাদের মতামত গ্রহণ করবেন এবং জনগণ ও দেশের অর্থনীতির উন্নয়নকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

শতকরা ৯৫ শতাংশ সাধারণ ব্যবসায়ী -৫ শতাংশ মুনাফালোভী সিন্ডিকেট এই বিভাজন সম্পর্কে গণমাধ্যম সত্যতা যাচাই করে জনগণের সামনে তুলে ধরবে বলে আশা করি।

ব্যবসায়ীরা বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলেও, লাভবান হবে কারা; সেটা আপনারা তুলে ধরুন। দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে যারা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় একটি মানসম্পন্ন স্মার্টফোন কেনার সুযোগ পাচ্ছেন? নাকি এই ভোক্তা শ্রেণিকেই একই মূল্যে নিম্নমানের মোড়ক বদলানো, লো কনফিগারেশনের হ্যান্ডসেট কিনতে বাধ্য করা ব্যবসায়ীরা? যদি দেশ, জাতি এবং সাধারণ জনগণের এতে কোনো উপকার থাকে, তাহলে আমরাও এতে সহযোগিতা করবো। কিন্তু আমরা এখানে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের লাভ ছাড়া অন্য কিছু দেখছি না। যদি সেটা না হয়, তাহলে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে কর পরিশোধ সাপেক্ষে অতিরিক্ত কোনো শর্ত ছাড়া, মোবাইল আমদানির সুযোগ আমাদেরও দেওয়া হোক। সবার জন্য উন্মুক্ত করা হোক।

বাংলাদেশের বিভিন্ন শপিংমলের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আরও ছিলেন- মো. ফয়সাল আজাদ, দিদারুল ইসলাম খান, ফারুক আহমেদ পিন্টু, সাইফুল ইসলাম এহসান, মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান, রবিউল আলম, মিজানুর রহমান মিলন, কাজী জিল্লুর রহমান জনি, মুহাম্মদ দ্বীন ইসলাম, কামরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম রুবেল, মোস্তাফিজুর রহমান, আব্দুল্লাহ আল ফারুকী, পারভেজ, মো. সেলিম গাজী, মো. পারভেজ, শাফায়েত হোসেন, নাসির উদ্দিন খান, মেহেদী হাসান, মো. সোহেল রানা, আনিসুর রহমান সোহেল, মো. রাসেল, মো. মজিবর রহমান, মো. সাজ্জাদুর রহমান বনি।


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/somokontho/public_html/wp-includes/functions.php on line 5481